সেতারের সুরে তিনি বিশ্বের মানুষের মন জয় করেছেন কিন্তু বাঙালিদের কাছে তাঁর একটি বিশেষ জায়গা রয়েছে। সৌজন্যে একাত্তরের ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে তার ভূমিকার জন্য তিনি বাঙালি জাতির কাছে বিশেষভাবে সম্মানিত। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামী জনগণের সাহায্যার্থে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ারে ১৯৭১-এর ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয় দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। এ আয়োজনের সঙ্গে যাঁরা সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের অন্যতম ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ। কনসার্টে অনেকের মধ্যে সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন জর্জ হ্যারিসন, তার গানের শিরোনাম ‘বাংলাদেশ’। এ গানের জন্য তৈরি হয়েছিল ‘বাংলাদেশ ধুন’ নামক নতুন সুর। ‘বাংলাদেশ ধুন’ যুগলবন্দি বাজান রবিশঙ্করের ও আলী আকবর খাঁ।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-তনয় হিসেবে সঙ্গীত-সাধনায় আত্মমগ্ন আলী আকবর জন্মভূমির দুর্গতি মোচনে সেদিন উদগ্রীব হয়েছিলেন। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে, যে অনুষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল। এ কনসার্টের প্রাপ্ত অর্থ বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য ইউনিসেফের শরণার্থী ফান্ডে দান করা হয়।

১৩ বছর বয়সে আলি আকবর খাঁ ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে এলাহাবাদে সর্ব প্রথম এক সঙ্গীত সম্মেলনে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তিন বছর পরে ১৯৩৯ সালের ডিসেম্বরে সেই একই সম্মেলনে তিনি পণ্ডিত রবিশংকরকে সরোদে সঙ্গত করেন; এটাই তাদের প্রথম যুগলবন্দী ছিল। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে বোম্বে অল ইন্ডিয়া রেডিও-র সাথে তিনি প্রথম কাজ করেন, এইবার তাকে তবলায় সঙ্গত করেছিলেন ঊস্তাদ আল্লা রাখা।১৯৪০ সাল থেকে তিনি লক্ষ্ণৌয়ের অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতে প্রতি মাসে যন্ত্রসঙ্গীত পরিবেশন করা শুরু করেন। অবশেষে পেশাদার সঙ্গীতকার হওয়ার উদ্দেশ্যে রবিশংকরের সাথে তিনিও ১৯৪৪ সালে মাইহার ত্যাগ করেন। রবিশংকর বম্বে চ’লে যান, আলি আকবর কিছুদিন লক্ষ্ণৌয়ের অল ইন্ডিয়া রেডিওতে সর্বকনিষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন, রেডিওর জন্য অর্কেষ্ট্রা রচনার দায়িত্বও তার উপরই ছিল।

১৯৪৩ সালে তার বাবার সুপারিশে যোধপুরের মহারাজা হনবন্ত সিংয়ের দরবারে তিনি সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে নিয়োজিত হন।সেখানে সঙ্গীত পরিবেশনের পাশাপাশি তিনি শেখানো ও সুর রচনার কাজও চালিয়ে যান, মহারাজাই তাকে ‘উস্তাদ’ উপাধিতে ভূষিত করেন।পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সময় যোধপুরে রাজতন্ত্রের সমাপ্তি ও বিমান দূর্ঘটনায় মহারাজার মৃত্যু ঘটলে আলি আকবর বম্বেতে চ’লে আসেন।

মুম্বইতে চেতন আনন্দের ‘আন্ধিয়াঁ’ (১৯৫২) সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে সুরারোপ করবার মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করতে থাকেন। এই চলচ্চিত্রটির প্রধান গানটি গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর। আলি আকবরকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে গানটি গেয়েছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের ‘দেবী’ (১৯৬০), তপন সিনহার ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ (১৯৬০) এবং মার্চেন্ট আইভরির ‘দ্য হাউসহোল্ডার’-এ কাজ করবার জন্উয তিনি ‘বছরের শ্রেষ্ঠ সংগীতকার’ হিসেবে পুরষ্কৃত হন। শংকর জয়কিষেণের সঙ্গীত পরিচালনায় ‘সীমা’ (১৯৫৫) শীর্ষক চলচ্চিত্রের একটি গানেও তিনি সরোদ বাজান। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে বার্নার্দো বার্তোলুচির পরিচালিত ‘লিট্‌ল্‌ বুদ্ধা’ শীর্ষক চলচ্চিত্রের জন্যও তিনি কিছু সুর রচনা করেন।

১৯৪৫ সালে তিনি এইচএমভি স্টুডিওতে ৭৮ আর. পি. এম. এর সিরিজ রেকর্ডকরা শুরু করেন, এই ডিস্কগুলি একেকটি সাকুল্যে তিন মিনিট দৈর্ঘ্যের সুর রেকর্ড করতে পারত। এই রকমই একটি রেকর্ডের জন্য তিনি ‘চন্দ্রনন্দন’ নামক একটি রাগ রচনা করলেন, রেকর্ডটিও বিশাল সাফল্য পেল। মালকোষ, চন্দ্রকোষ, নন্দকোষ ও কৌশি কানাড়া- এই চারটি রাগের উপর ভিত্তি ক’রে এই নতুন রাগটি তিনি রচনা করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে এই রাগটি ২২ মিনিট দৈর্ঘ্যে পুনরায় রেকর্ড করা হ’লে সারা পৃথিবী জুড়ে এই রাগটির নিজস্ব শ্রোতা তৈরি হয়।

ভারতে সঙ্গীত পরিবেশনার পাশাপাশি তিনি পশ্চিমের দেশগুলিতেও প্রচুর ঘুরেছেন। ১৯৫৬ সালে হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখানো ও প্রচারের উদ্দেশ্যে কলকাতায় তিনি ‘আলি আকবর কলেজ অব মিউজিক’ প্রতিষ্ঠা করেন, ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলিতে একই নামে তিনি আরেকটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে সান রাফায়েলে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬৯ সালে বস্টনে পিবডি ম্যাসন কনসার্ট সিরিজে তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করেন, তবলা সঙ্গতে ছিলেন পণ্ডিত শংকর ঘোষ। ১৯৮৫ সালে তিনি তার প্রতিষ্ঠানের আরেকটি শাখা খোলেন সুইৎজারল্যান্ডের বাসেলে। তিনি প্রথম ভারতীয় হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে লং প্লেয়ার অ্যালবামে রেকর্ড করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দূরদর্শনে সরোদ পরিবেশন করেন।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.