সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : মন্ত্রীসভায় নয়া শিক্ষানীতি ২০২০-র অনুমোদন: শিক্ষার উপর আবার আক্রমণ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সংসদে শিক্ষানীতির উপর কোনও আলোচনাই হয়নি। অতিমারী সংকটের সুযোগে শিক্ষার বেসরকারীকরণ হয়েছে বলে মনে করছে বাম ছাত্র সংগঠন আইসা। ফলে যার আর্থিক অবস্থা যত ভালো সে তত উচ্চশিক্ষিত হতে পারবে। এমনটাই মনে করছে তারা।

মন্ত্রীসভা নয়া শিক্ষানীতির খসড়া অনুমোদন করে দিয়েছে। সরকারের দাবি যে, এই শিক্ষানীতি শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি ও সমতার উদ্দেশ্যে তৈরী কিন্তু একটু বিস্তারিত ভাবে খসড়াটি তলিয়ে দেখলে অন্য কিছু প্রকাশ পাচ্ছে। এই অনুমোদিত নয়া শিক্ষানীতি আর্থ-সামাজিক দিক থেকে সমাজের প্রান্তসীমার মানুষজনকে আরও বেশি প্রান্তিক* করে দেওয়ার ব্যবস্থাই করবে। উচ্চশিক্ষায় বহুপথে প্রবেশ/প্রস্থান আসলে এটাই বোঝাতে চাইছে যে, কেবলমাত্র আর্থিক সচ্ছলতা থাকা ছাত্রছাত্রীরাই ডিগ্রী অর্জন করতে পারবে। অপেক্ষাকৃত গরিব শিক্ষার্থীদেরকে ডিপ্লোমা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। বিকল্প কী হতে পারতো? সরকার বৃত্তি (স্কলারশিপ) প্রকল্প গুলো বাড়িয়ে প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকে অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা ছাড়াই ডিগ্রী অর্জনে সহায়তা করতে পারতো।
উচ্চশিক্ষা যেন ম্যাকডোনাল্ডের “ক্রেডিট ব্যাঙ্ক” যুক্ত বিপণীতে পরিণত হল, ফেলো কড়ি মাখো তেল। অর্থাৎ কোনো ছাত্রের বেশি টাকা জমা থাকলে সে বেশি সুযোগসুবিধা ভোগ করতে পারে যেমন ম্যাকডোনাল্ডে কেউ বেশি টাকা গচ্ছিত রাখলে সে অনেক বেশি চিজ লাগানো বার্গার ও সাথে কোক পানীয় অর্ডার করতে পারে আর বাকিদেরকে শুকনো রুটি চিবিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।

কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বাধিকার একরকম হবেনা, হবে স্তরভিত্তিক। স্বাধিকারের মাত্রা নির্ভর করবে মূল্যায়নের রেটিংয়ের উপর। বেশি রেটিং থাকা প্রতিষ্ঠান গুলো নিজের ইচ্ছামত ফি বৃদ্ধি করে গরিব ছাত্রছাত্রীদেরকে উৎকৃষ্ট শিক্ষার আঙিনা থেকে বার করে দিতে পারবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো পরিদর্শন (ইনস্পেকশন) ছাড়াই নিজেদের অবস্থা নিজেরা ঘোষণা করতে হবে। সুতরাং কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ তার আর্থিক মুনাফার দিক বুঝেই তাদের পড়াশোনার অবস্থা, পরিকাঠামো, ফি ও অন্যান্য বিষয় জানাতে পারে।

দেশের ১০০ টা শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন শিক্ষা চালু করার দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। এটা সমাজের প্রান্তসীমায় থাকা শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার ছক ছাড়া আর কিছুই নয়। একইভাবে দূরশিক্ষায় বেশি জোর দেওয়াটাও শিক্ষার ধারণার বিরুদ্ধেই যায়। .ইউজিসি সহ অন্যান্য নিয়ামক সংস্থাগুলোকে ভেঙে দিয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে যা অর্থ যোগান, সিলেবাস নির্ধারণ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যকলাপের বিষয়গুলো দেখবে। এই বোর্ড অফ গভর্নর পরিচালন মডেল স্বাধিকার ও শিক্ষার উৎকর্ষ নষ্ট করে শিক্ষাব্যবস্থাকে কেন্দ্রের কুক্ষিগত করবে।

.নয়া শিক্ষানীতি আরো বলছে যে, সরকারী ও বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো ফারাক থাকবেনা; যা আসলে আম আদমির শিক্ষার সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পিছনে খরচ করার দায়ভার ব্যাপকভাবে সরকারের কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলার দিকেই নির্দেশ করছে। বেশিসংখ্যক মানুষকে শিক্ষার আওতায় আনার বুলির মুখোশের আড়ালে আদতে এই শিক্ষানীতি আরো বেশি মানুষকে শিক্ষার আঙিনা থেকে বার করে দেওয়ার বিধিব্যবস্থা ছাড়া কিছুই নয়। AISA এই বিষয়ে খুব শীঘ্রই আরো বিস্তারিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করবে। খসড়াটির প্রাথমিক পাঠ এটুকু দেখিয়ে দিচ্ছে যে, শিক্ষার বেসরকারীকরণ ও বেশি মানুষকে শিক্ষার আঙিনা থেকে ছেঁটে ফেলা ছাড়া আর কিছুই এই শিক্ষানীতির মূল উদ্দেশ্য নয়। AISA এই শিক্ষাবিরোধী নীতির খসড়াটি প্রত্যাখান করছে এবং অবিলম্বে এটা প্রত্যাহার করার ও আগে এটা সংসদে আলোচনার দাবি জানাচ্ছে।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ