মুম্বই: মহারাষ্ট্রে কুর্সির লড়াই গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। দেবেন্দ্র ফডণবীশের সরকার ‘অবৈধ’ বলে গত শনিবারেই শীর্ষ আদালতে এই নিয়ে রিট পিটিশন দাখিল করেছিল কংগ্রেস-বিজেপি-শিবসেনা।

সোমবার সকালেই সুপ্রিম কোর্টে মহারাষ্ট্র মামলার পরবর্তী শুনানি হতে চলেছে। অন্য দিকে এনসিপি-র অন্দরে শুরু হয়ে গিয়েছে শরদ এবং অজিত— দুই পাওয়ারের দ্বন্দ্ব। রবিবারেই একের পর এক টুইট পাল্টা টুইট করেন শরদ এবং অজিত পাওয়ার। এই ‘পাওয়ার-প্লে’ ঘিরেই রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শুরু হয়েছে জল্পনা।

রবিবারের সকালে শুনানির সময়েই মহারাষ্ট্র মামলায় সব পক্ষকে নোটিস দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালতের তিন বিচারপতির বেঞ্চ। কেন্দ্রকে নির্দেশ দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, সোমবার সকালে দেবেন্দ্র ফডণবীসের তরফে রাজ্যপালকে দেওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতার চিঠি এবং রাজ্যপালের ফডণবীসকে সরকার গড়তে আমন্ত্রণ জানানোর চিঠি জমা দিতে হবে। মামলাটি পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিল বিজেপি এবং কেন্দ্র। গতকালই সেই আর্জি খারিজ করে দিয়েছে আদালত।

এ দিকে শরদ এবং অজিত— দুই পাওয়ারের দ্বন্দ্বে এনসিপি বিধায়কেরা কার দিকে থাকবেন, তার উপরেই অনেকটা নির্ভর করছে বর্তমান মহারাষ্ট্র বিধানসভার ভবিষ্যত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন যা পরিস্থিতি, তাতে এনসিপি-র বিধায়করা যদি এককাট্টা হয়ে থাকেন তাহলে থাকলে চাপে পড়বে ফডণবীসের সরকার। গতকাল রাতেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন অজিত পাওয়ার। পরে মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকে জানানো হয়, মূলত কৃষক সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে এই বৈঠকে । অজিতের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির একাধিক প্রথম সারির নেতা এবং আইনজীবীরাও।

গত শনিবার সাত সকালে এনসিপি নেতা অজিত উপমুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিতেই শোরগোল পড়ে যায় রাজ্য রাজনীতিতে। আকস্মিক এই ধাক্কা কোনও মতে সামলে নিয়ে নিজেদের পরবর্তী ঘুঁটি সাজাতে নামে কংগ্রেস ও শিবসেনা। কংগ্রেস এবং শিবসেনা দুই পক্ষই নিজেদের বিধায়কদের কার্যত লোকচক্ষুর আড়ালে রেখে দিলেও এনসিপি বিধায়কেরা শরদ না অজিত কোন পক্ষে ঝুঁকবেন, তা নিয়ে এখনও ধন্দে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সরকার গড়ার ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে এনসিপি আড়াআড়ি ভাবে ভেঙে যেতে পারে এমন আশঙ্কাও করছেন অনেকে। রবিবার বিকেলেই একটি টুইট করেন অজিত পাওয়ার। সেখানে তিনি জানান, এনসিপি তিনি ছাড়েননি। শরদ পাওয়ারই তাঁর প্রকৃত নেতা এবং বিজেপি-এনসিপির এই জোট সরকার রাজ্যে স্থিরতা আনবে। আর এ দিনের এই টুইটই ধোঁয়াশায় আরও ইন্ধন দিয়েছে।

যদিও কিছুক্ষণ পরেই শরদ পাওয়ার পাল্টা টুইট করে জানান সম্পূর্ণ মিথ্যা বলছেন অজিত। এই ধরনের কোনও জোট নেই। রবিবার সন্ধেয় উদ্ধব ঠাকরের সঙ্গে বৈঠকে শরদ শিবির দাবি করে, তাদের পক্ষে ৫০ জন এনসিপি বিধায়কের সমর্থন রয়েছে। দলীয় বিধায়ক অনিল পাটিল-সহ আরও দু’জন আজ অজিত শিবির থেকে এসে যোগ দিয়েছেন শরদ পাওয়ারের শিবিরে। বিজেপির হাতে এখন পড়ে রয়েছেন মাত্র চার জন। কিন্তু, শরদ শিবিরের এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে বিজেপি নেতা আশিস সেলার পাল্টা দাবি করেন, ‘বিজেপি, নির্দল ও এনসিপি মিলিয়ে অন্তত ১৭০ জন আমাদের সঙ্গে রয়েছেন।’ বিজেপির দাবি, এখন চুপ থাকলেও আসল সময়ে ছবিটা অন্যরকম দাঁড়াবে। অর্থাৎ ভোটাভুটির সময়ে অনেক এনসিপি বিধায়কই অজিতের সমর্থনে এগিয়ে আসবেন। অন্যদিকে নিজেদের বিধায়কদের প্রতি আস্থা রাখলেও এনসিপি শিবির পাল্টা দাবি করেছে, সমর্থন কিনতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিজেপি। বিপুল অঙ্কের অর্থ ছাড়াও প্রভাবশালী বিধায়কদের মন্ত্রিত্বের লোভ দেখিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিক ফোন যাচ্ছে অজিত পাওয়ারের পক্ষ থেকে। এই ‘ঘোড়া-কেনাবেচার’ বিষয়টি এর আগেও একাধিক বার দাবি করেছিল বিরোধীরা। এনসিপি বিধায়কেরা যে হোটেলে রয়েছেন, সেখানে বিজেপি চর পাঠিয়ে নানা রকম প্রলোভন দেখাচ্ছে বলেও দাবি করেছিল এনসিপি। এরপর গত রাতেই হোটেল বদল করা হয়েছে বিধায়কদের।

রবিবার মামলা সুপ্রিম কোর্টে ওঠার পর থেকেই নীরবই ছিলেন অজিত পাওয়ার। কিন্তু বিকেল ৪টে ১৩ মিনিটে প্রথম নিজের টুইটারের হ্যান্ডেলে নিজেকে মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী লেখেন তিনি। এর পর প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-সহ বিজেপির প্রায় কুড়ি জন নেতা এবং দেবেন্দ্র ফডণবীসের স্ত্রীর অভিনন্দন বার্তা রি-টুইটে জবাব দেন। সব শেষেই টুইটারে বোমা ফাটিয়ে তিনি লেখেন, ‘আমি এখনও এনসিপি-তেই আছি। শরদই তাঁর নেতা। সকলে একটু ধৈর্য ধরুন!’

রাজনৈতিক মহলের অনেকেই বলছেন, ওই টুইটেই এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছেন অজিত। সোমবার সুপ্রিম কোর্টে মহারাষ্ট্রের সরকার গড়া সংক্রান্ত মামলার শুনানি। তার আগে নিজের দলীয় পরিচয় আরও একবার জনসমক্ষে স্পষ্ট করে দিলেন তিনি । অন্য দিকে, দলের বাকি বিধায়ক এবং ঘনিষ্ঠদের বার্তা দিলেন, তিনি এখনও আছেন। দল ছাড়েননি। বাকিরাও যেন তাঁর সমর্থনে এসে দাঁড়ান। এর প্রায় আধঘণ্টা পরেই পাল্টা টুইট করেন শরদ পাওয়ার। পাল্টা রিটুইট করে তিনি বলেন, ‘বিজেপির সঙ্গে হাত মেলানোর প্রশ্নই নেই। অজিতের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল। এই ধরনের বার্তা দিয়ে দলকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন।’ এই টুইটে কংগ্রেস এবং শিবসেনাকেও বার্তা দিয়েছেন তিনি। তিন দলের জোট অক্ষুণ্ণই রয়েছে বলে জানান তিনি।

অন্য দিকে আরও একটি প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে যে, দলের বিদ্রোহ করে অজিত বিজেপির সঙ্গে হাত মেলালেও তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার না করলেও, সাময়িক ভাবে সাসপেন্ড বা কারণ দর্শানোর নোটিস পর্যন্ত ধরাননি এনসিপি নেতৃত্ব। শুধু পরিষদীয় দলনেতার পদটুকু কেড়েই থেমেছেন তাড়া। রবিবার শরদের নির্দেশে দফায় দফায় অজিতকে বোঝানোর চেষ্টা চললেও সূত্রের খবর চিঁড়ে ভেজেনি। অজিতের বদলে পরিষদীয় দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া জয়ন্ত পাটিল রবিবারই দেখা করেন বিদ্রোহী নেতার সঙ্গে। তাতেও কাজ না হওয়ায় শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউত সন্ধেয় এক দফা বৈঠক করেন অজিতের সঙ্গে। কিন্তু এত চেষ্টার পরেও নিজের অবস্থানে এখনও অনড় রয়েছেন অজিত।

প্রশ্ন হল, অজিতকে ফেরাতে হঠাৎ এত তৎপর হয়ে উঠল কেন এনসিপি? বিজেপি নেতা আশিস শেলার এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘অজিত যখন রাষ্ট্রপতিকে এনসিপির সমর্থনের চিঠি দেন, তখন তিনি এনসিপির পরিষদীয় নেতা। পরে তাঁর জায়গায় অন্য ব্যক্তিকে দল নিযুক্ত করলেও আশা করা যায়, অজিতের চিঠিকেই গুরুত্ব দেবে রাজ্যপাল বা আদালত। সে ক্ষেত্রে অজিত হুইপ জারি করার পরে বিধায়কেরা তাঁর নির্দেশ না মানলে দলত্যাগ আইনে বিধায়কদের সদস্যপদ খারিজ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’ এনসিপির পাল্টা যুক্তি, কে কোন পদে থাকবেন, তা নিয়ে দলের সভাপতির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসাবে ধরা হয়। কংগ্রেস নেতা অশোক চহ্বান রবিবার বলেন, ‘অনৈতিক ভাবে চিঠির ফায়দা তুলেছেন অজিত।’ রাতে এনসিপি অভিযোগ করেছে, অজিতের সঙ্গে থাকা তিন বিধায়ককে দিল্লি উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছে বিজেপি। কিন্তু দিল্লি গেলেও সরকার গড়ার ক্ষেত্রে এনসিপি-র সঙ্গেই থাকতে চান বলে এনসিপি নেতৃত্বকে বার্তা পাঠিয়েছেন তাঁরা।

তিন দলই তাকিয়ে শুনানির দিকে। কবে কোর্ট বিধানসভায় ভোটের দিন ধার্য করে, তার উপরে বিধায়কদের ধরে রাখা নির্ভর করছে বলে ধারণা অনেকের। যত দিন যাবে, বিধায়ক কেনাবেচায় বিজেপি তত সুবিধে পাবে বলে আশঙ্কা বিরোধীদের।