স্টাফ রিপোর্টার, বর্ধমান: চাষের জমিয়ে গজিয়ে উঠছে কংক্রিটের জঙ্গল৷ ক্রমশ কমছে চাষের এলাকা৷ যতটুকু পড়ে রয়েছে তা এখন চাষযোগ্য নয়৷ এমনই ছবি বর্ধমান জেলা কৃষি দফতরের অধীনের জেলা বীজ খামারের৷ ১৯৬০ সালে প্রায় ২০৩ একর জায়গাকে অধিগ্রহণ করে তৈরী হয়েছিল এই বীজ খামার। আজ তার পরিবর্তিত চেহারা ক্ষোভ তৈরি করছে সাধারণ মানুষের মনে৷

জেলা বীজ খামারের সার্টিফায়েড তথা বীজ খামার থেকে উত্পাদিত ধানের বীজ কেনার জন্য রীতিমত আগ্রহী ছিলেন চাষীরা৷ স্বাভাবিকভাবেই একের পর এক ভবন তৈরি হওয়ায় উন্নতমানের ধানবীজের উত্পাদন কম হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি খামার সূত্রে জানা গিয়েছে, যে জমিতে বর্তমানে কৃষি কলেজের নতুন ভবন তৈরী হচ্ছে সেখানেই একসময় সরষে, যব, গমের ব্যাপক চাষ হত। হত অন্যান্য বিভিন্ন ধরণের চাষও।

সেই জমিতেই কৃষি কলেজের নতুন ভবন তৈরী হওয়ায় রীতিমত এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ হলেও মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না অনেকেই। যদিও এব্যাপারে কৃষি দফতরের আধিকারিকরা মুখ খুলতে রাজি হননি। যদিও মুখ্যমন্ত্রীর কৃষি উপদেষ্টা প্রদীপ মজুমদার জানিয়েছেন, কৃষি কলেজের জন্য যে জমি দেওয়া হচ্ছে তা ব্যবহার করার জন্য। কিভাবে তাঁরা জমি ব্যবহার করছেন তা দেখেই পরবর্তী ধাপে তাঁদের জমি দেওয়া হবে।

তিনি জানিয়েছেন, উন্নতমানের বীজ ও চাষের সামগ্রিক উন্নতির জন্য গবেষণা হবে এখানে। ফলে তাতে লাভই হবে চাষীদের। তিনি জানিয়েছেন, কল্যাণী ফার্ম থেকে যে বীজ উত্পাদিত হয় তা কৃষি দপ্তরকেই দেওয়া হয়। এখানেও তাঁরা আশা করছেন কৃষি কলেজ উন্নত গবেষণার মাধ্যমে আরও বেশি পরিমাণে বীজ উত্পাদনে সহায়তা করবে।

তবে এলাকার মানুষ বলছেন তৈরি হওয়ার পর থেকে একটু একটু করে গোটা খামারকে ঘিরেই শুরু হয় নানাবিধ চাষ। খামারের ভেতরে থাকা বালুকা (মতান্তরে বেহুলা) নদী সহ রয়েছে বেশ কয়েকটি জলাশয়ও। তৈরী হয়েছিল কৃষি দফতরের কর্মী ও অফিসারদের জন্য কোয়ার্টারও।

সম্প্রতি রাজ্য কৃষি দপ্তর থেকে এই খামারে অবস্থিত কৃষি কলেজের জন্য প্রায় ৭৩ একর জমিকে ব্যবহার করার জন্য অনুমতি দিয়েছে। ক্যাবিনেট সিদ্ধান্ত ছাড়া কিভাবে চাষযোগ্য এই জমিকে কৃষি কলেজের হাতে ব্যবহার করার জন্য তুলে দেওয়া হল তা নিয়েও চর্চা শুরু হয়েছে। চলতি বছরেই কয়েকদফায় এব্যাপারে উচ্চপর্যায়ের আধিকারিকদের নিয়ে বৈঠকও হয়েছে।

সূত্রের খবর, প্রথম দিকে প্রায় ২৫ একর জমিকে কৃষি কলেজের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, পরে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে কেবলমাত্র ব্যবহার করার জন্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত জারি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই কলেজ ভবন তৈরী করতে জেলা কৃষি খামারের উর্বর কৃষিজমিকে দেওয়া নিয়ে বিতর্ক দানা বেঁধেছে।

নতুন ভবন হয়ে গেলে প্রায় ২৪০জন পড়ুয়ার আসন থাকবে। কলেজ সূত্রে জানা গেছে, এখানে এগ্রিকালচারের ১৭টি বিভাগ, হর্টিকালচারের ৫টি বিভাগ এবং এগ্রি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ৫টি বিভাগ রয়েছে। জেলা কৃষি খামার সূত্রে জানা গেছে, গতবছর ৬৩ একরে ৭৩৫ কুইণ্টাল ধানবীজ এবং আলুবীজ উত্পাদিত হয় ২৩৭ কুইণ্টাল।

কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই নতুন দ্বিতল ভবনের একদিকে যেমন থাকবে ২০টি ঘরের অফিস ঘর তথা প্রশাসনিক ভবন। তেমনি অন্যদিকে থাকবে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য আলাদা হোষ্টেল। বর্তমানে এই কলেজের পড়ুয়া রয়েছেন প্রায় ১২০জন। এদিকে কৃষি কলেজের জন্য জমি দেওয়ায় মাত্র এবছর ৫২ একরে চাষ হয়েছে। ফলে উত্পাদন আরও কমার আশংকা থাকছে।

আরও পড়ুন: মাংস রান্নায় দেরি হওয়ায় রাগে মেয়েকে খুন বাবার

মোট প্রায় ২০৩ একর জায়গা রয়েছে জেলা কৃষি তথা বীজ খামারের। ইতিমধ্যেই কয়েকদফায় এই খামারের চাষযোগ্য জমিতে তৈরী হয়েছে বিভিন্ন প্রকল্প। প্রায় ৫০ একর জায়গায় তৈরী হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্নের মাটি তীর্থ কৃষি কথার স্থায়ী প্রাঙ্গণ। এছাড়াও তৈরী হয়েছে খাদ্য দফতরের বিশালাকার গোডাউন। তৈরী হয়েছে কৃষক বাজারও। প্রায় সম্পূর্ণ হওয়ার পথে অন্য আরও বিশালাকার ভবনের কাজ।

এর ফলে ক্রমশই কমছে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ। এদিকে, রাজ্য কৃষি দফতর থেকে অনুমোদন পেয়েই প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে চলেছে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সটেনশন বর্ধমান কৃষি কলেজের নতুন ভবনের কাজ। আগামী জুলাই মাসের নতুন সেশনেই নতুন ভবনে কলেজ চালুর প্রত্যাশা করছেন বর্ধমানের কৃষি কলেজের আধিকারিকরা।