প্রসেনজিৎ চৌধুরী: তাপপ্রবাহ শুরু হতে আরও কিছুদিন বাকি৷ পশ্চিম বর্ধমানের লু প্রাণ কেড়ে নিতে তেড়ে আসে৷ রাজ্যের খনি-শিল্পাঞ্চল শুকিয়ে যায়৷ তবে এরই মধ্যে যেন তেড়ে এসেছে ভয়ের হাওয়া৷ এক কালরাত্রি পার করেছেন তাঁরা৷ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মরিয়া প্রশাসন৷ কিন্তু ছড়িয়ে আছে দুর্ভাবনার রেশ৷ উন্মত্ত একদল মানুষের কাণ্ডে তাল কেটেছে কয়লা শহরের৷ এখানকার বাসিন্দারা দেখেছেন দুখু মিঞা, শৈলজানন্দের শহরে এ কী ব্যাপার !

রানিগঞ্জ৷ দেশের সর্বোত্তম উৎকৃষ্ট মানের কয়লার স্থান৷ ভারতীয় শিল্প বিপ্লবের প্রাণকেন্দ্র৷ বাঙালি-অবাঙালি মানুষের পাশাপাশি বাস৷ সেই তাল কেটে গিয়েছে আচমকা৷ গাড়িটা শিয়ারশোল মোড়ে আসতেই ছবিটা আরও পরিষ্কার হয়ে গেল৷ মোড়ে মোড়ে পুলিশ পিকেট৷ টহল দিচ্ছে ব়্যাফ জওয়ানরা৷ গরম বাড়ছে ততই বাড়ছে ভয়৷ যদি আবারও সেরকম কিছু হয়৷ বন্ধ দোকান৷ জাতীয় সড়ক ছেড়ে রানিগঞ্জের ভিতর দিয়ে ঢুকতেই বোঝা গেল কী কাণ্ডটাই না ঘটানো হয়েছে৷
রাস্তার ধারে একটা কচুরির দোকান৷ সেখানে কেউ নেই৷ কী গরম, কী ঠাণ্ডা রানিগঞ্জ শহরে কচুরি অন্যতম খাদ্য৷ আপাতত দোকানদার ঝাঁপ ফেলেছেন৷ উঁকি দিয়ে গেল দু একজন৷

কী চাই আপনার?
তাড়াতাড়ি চলে যান৷
বাইরে থেকে আসছি, এখানে কী হয়েছে দাদা?
আতঙ্কিত মুখ বলে দিল অনেক কিছু৷ দোকানের পাশ দিয়ে কে যেন উঁকি মেরেই সরে গেল৷ শহরের ভিতর খানিকটা আরও ঢুকতেই বোঝা গেল গতকালের অবস্থা৷ রাস্তা এখানে প্রায় শুনসান৷ ভয়াবহ তাণ্ডবের জেরে কুঁকড়ে গিয়েছে রানিগঞ্জ৷

কয়লা শহরের অন্যতম এলাকা গির্জাপাড়া৷ সামনেই মাঠ৷ আর মাঠের ওপারে রানিগঞ্জ স্টেশন৷ গির্জাপাড়া ছাড়িয়ে সোজা রাস্তা ধরে রেলের পুল পেরিয়ে পড়বে বাসস্ট্যান্ড৷ আসানসোল-বাঁকুড়া-দুর্গাপুর-পানাগড়-গলসি যাওয়ার হাঁকাহাঁকিতে অন্যান্য দিন গমগম করে৷ সেই এলাকা এখন প্রাণহীন৷ দু’একজন সন্ত্রস্ত হয়ে রাস্তা পার করছেন৷ দোকানগুলোর সামনে শুধু শুয়ে আছে কয়েকটা কুকুর৷ প্রাণচঞ্চল রানিগঞ্জ শুকিয়ে গিয়েছে৷

বাস স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন এক যুবক৷ দীনেশ খাণ্ডেলওয়াল (নাম পরিবর্তিত)৷ স্থানীয় ব্যবসাদার৷

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানালেন, ভীত আমরা৷ এরকম দেখিনি কখনও৷ রানিগঞ্জের রামনবমী জনপ্রিয়৷ প্রতিবারই ধুমধাম করে হয়৷ কিন্তু…ভয়ে চুপ করে গেলেন তিনি৷ অস্পষ্ট শব্দে বললেন রাম কা নাম বদনাম না করো…

কয়লা শহর রানিগঞ্জ৷ স্বাধীনোত্তর ভারতের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবেই সুপরিচিত ছিল৷ কয়লা শিল্পের চাবিকাঠি তারই হাতে৷ এখানেই ভূগর্ভে সঞ্চিত কয়লা ভাণ্ডার বিশ্বের ঈর্ষার কারণ৷ এই শহরেই তৈরি হয় ভারতের প্রথম কয়লা বাণিজ্যের কেন্দ্র৷ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর তার জন্মদাতা৷

পরে রানিগঞ্জের বিশেষ পরিচিত হয়েছে দুখু মিঞা (কাজি নজরুল ইসলাম) ও শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্য বিচ্ছুরণে৷ দুই সহপাঠীর স্মৃতিতে বার বার রানিগঞ্জ উঠে এসেছে৷ রুক্ষ প্রান্তরে দুখু মিঞার বাঁশি বাতাসের সঙ্গে কথা বলত৷ গভীর রাতে শৈলজানন্দের কলম ধরে রাখত কয়লা দেশের কথা৷ সেই ‘কয়লাকুঠির দেশ’ এখন কর্মচঞ্চলতা ভুলে শুধু ধর্মকে ঘিরে আতঙ্কের প্রহর পার করছে৷

তবুও কেউ অস্পষ্ট স্বরে বলেন-রাম কা নাম বদনাম না করো..