শ্রীনগর: ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের পর কেটে গিয়েছে অনেকগুলি দিন। কেন্দ্রীয় সরকার এবং প্রশাসনের তরফে জম্মু ও কাশ্মীরবাসীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার কথা ঘোষণা করা হলেও কাশ্মীরবাসী যে এখনও স্বাভাবিক হতে পারছেনা তা বেশ ভালোমত বোঝা যাচ্ছে।

সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যপাল সত্যপাল নায়েক মঙ্গলবার সরকারি তরফে উপত্যকাবাসীর উদ্দ্যেশ্যে একটি বিবৃতি দিয়ে বুধবার থেকে কাশ্মীরের বন্ধ স্কুল-কলেজগুলি পুনরায় খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। জানা গিয়েছে রাজ্যপালের নির্দেশ মত বুধবার থেকেই খুলে যায় উপত্যকার বিভিন্ন স্কুল,কলেজ এবং বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি। কিন্তু স্কুল কলেজ খোলাই সার হয়েছে প্রশাসনের। কারন আতঙ্ক এখনও সেইভাবে কাটিয়ে উঠতে পারেনি উপত্যকাবাসীর অনেকেই। যার প্রভাব এদিন দেখা গিয়েছে স্কুল কলেজগুলির হাজিরাতে।

সূত্রের খবর, বর্তমানে জম্মু ও কাশ্মীরে যে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়েছে তাতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার খুবই কম ছিল। কারন হিসাবে স্থানীয় প্রশাসনের তরফে মনে করা হচ্ছে ৩৭০ ধারা বাতিলের ছেষট্টি দিন পরেও কাশ্মীরের বড় বড় রাস্তা-ঘাট, বাজার সরকারি দফতর এবং স্কুল কলেজের সামনে দিয়ে যেভাবে সশস্ত্র বাহিনী ঘুরে বেড়াছে তাতে যেকোনও সময় আবার কোনও বড়সড় কিছু ঘটবে কিনা সেই আতঙ্কে ভীত হয়ে বেশিরভাগ অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের নিয়ে কোনও রকম ঝুঁকি নিতে চাইছেননা। ফলে স্বাভাবিক কারনে বুধবার উপত্যকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে গেলেও অভিভাবকদের ভীতির কারনে তাঁরা তাঁদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে-কলেজে পাঠাচ্ছেননা এমনটাই প্রশাসনের তরফে মনে করা হচ্ছে।

আসন্ন পরীক্ষা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত রুব্বান নামের শ্রীনগর কলেজের বিকমের এক পড়ুয়া এদিন জানিয়েছেন, জম্মু ও কাশ্মীর সহ রাজধানী শ্রীনগরে এই মুহূর্তে মানুষের সব থেকে বড় অসুবিধা হল মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের অব্যবস্থা এবং সঙ্গে পরিবহন সমস্যাও রয়েছে। মাঝে মধ্যেই কাশ্মীরে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে ইন্টারনেট এবং টেলিফোন লাইনের সংযোগ ব্যবস্থা এছাড়াও রাস্তা দিয়ে সবসময় বাহিনী ঘোরাফেরা করায় একটা আতঙ্ক থেকে যাচ্ছে সকলের মনে যার কারনে গনপরিবহনের যানবাহনের দেখাও মিলছেনা সেইভাবে। ফলে বেশিরভাগ অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে যার কারনে তাঁরা সন্তানদের স্কুল কলেজে পাঠাতে সাহস পাচ্ছেন না। শুধু রুব্বান একা নয় একই অবস্থার কথা শোনা গেল বুধবার সকালে শ্রীনগর কলেজে আসা অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের মুখেও।

বুধবার শ্রীনগর কলেজের স্থগিত চূড়ান্ত পরীক্ষার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে কলেজে আসেন আকিব নামের এক ছাত্র। সে জানিয়েছে,’ বুধবার সে চূড়ান্ত পরীক্ষার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে কলেজে এলে দেখতে পাই এদিন কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার খুবই সামান্য। তিনি আরও জানিয়েছেন, প্রায় সব অভিভাবকরা একই বিষয় নিয়ে চিন্তিত। ‘ এছাড়াও উপত্যকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং রাস্তায় পরিবহনের যানবাহন সীমিত হওয়ায় ঘর থেকে বেড়তে ভয় পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ’। আর বুধবার স্কুল কলেজগুলিতে পড়ুয়াদের হাজিরা প্রমান করে দেয় উপত্যকার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ব্যাপারে পুরোপুরি ভাবে প্রশাসনের উপর আস্থা রাখতে পারছেননা কাশ্মীরবাসী। কারন প্রশাসন অনেক আগেই স্কুল চালুর কথা ঘোষণা করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে পড়ুয়াদের বড় সংখ্যকই উপস্থিত নেই ক্লাসে। ফলে স্বাভাবিক ভাবে কম ছাত্র ছাত্রীর কারনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলির কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে।

এদিন কাশ্মীরের অভিভাবকদের তরফে জানানো হয়েছে, ৩৭০ ধারা বাতিলের পর থেকে এখনও পর্যন্ত জম্মু ও কাশ্মীরের হাওয়ার কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। ধারা বাতিল নিয়ে রাজনৈতিক মহল থেকে আন্তর্জাতিক স্তরে কাশ্মীর নিয়ে তরজা অব্যাহত রয়েছে। এমত অবস্থায় প্রশাসন কোনও পদক্ষেপ না নেওয়ায় স্কুল- কলেজগুলিতে পড়ুয়াদের পড়াশুনোর ক্ষেত্রে শান্তির পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা। নিজের সন্তানকে নিয়ে ভীত এক অভিভাবক জানিয়েছেন, ‘বর্তমানে এখানে যা পরিস্থিতি তাতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বেশিরভাগ অভিভাবকই ফলে কোনও রকম ঝুঁকি নিয়ে কেউই তাঁদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চাইছেন না’।

প্রসঙ্গত, স্বাধীনতা দিবসের আগে অর্থাৎ গত ৫ অগস্ট কেন্দ্রীয় সরকার জম্মু ও কাশ্মীরের ক্ষেত্রে স্পেশাল স্ট্যাটাস প্রত্যাহার করে নেয়। তারপর থেকেই কাশ্মীর নিয়ে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের রুটিনমাফিক অশান্তি এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চেও অশান্তি অব্যাহত থাকে। যার ফলে সরকারি তরফে কাশ্মীরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ইন্টারনেট টেলিফোন ব্যবস্থা। বন্ধ ছিল স্কুল-কলেজ, বাজার ও পরিবহন ব্যবস্থাও। জানা গিয়েছে, পরিস্থিতি একটু উন্নতি হলে প্রশাসনের তরফে কিছু কিছু জায়গা ব্যতিক্রম রেখে প্রায় সব জায়গাতেই সরকারি-বেসরকারি জনপরিষেবাগুলি চালু করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল।