- Advertisement -
সমীররঞ্জন মজুমদার, সিবিআই-এর প্রাক্তন এসপি

নন্দীগ্রামের ঘটনা আমার স্মৃতিতে খুবই উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে৷ কারণ, কর্মসূত্রে এর আগে আমি ভারতের বেশ কয়েকটি বড় ঘটনা যেমন, গো-খাদ্য কেলেঙ্কারি, ভোপালের বিষাক্ত গ্যাস লিকের তদন্ত করলেও, সেগুলির সঙ্গে নন্দীগ্রামের অনেক তফাৎ রয়েছে৷ কারণ, পুলিশের গুলিতে এখানে ১৪ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল৷ আহত হয়েছিলেন বহু মানুষ৷ যাই হোক, মূল কথায় আসি৷

আমি তখন সিবিআই-এর অ্যাডিশনাল এসপি পদমর্যাদার এক আধিকারিক৷ ২০০৭-এর ১৪ মার্চ৷ সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানতে পারি, পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ১৪ জন মানুষকে গুলি করে মারা হয়েছে৷ এই ঘটনায় গোটা পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক গোলযোগ শুরু হয়ে যায়৷ তৃণমূল কংগ্রেস সহ বিরোধী অন্য রাজনৈতিক দলগুলি রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে সামিল হয়৷ বিষয়টি শুনেই বুঝতে পেরেছিলাম, এই মামলা রাজ্য পুলিশের হাতে থাকবে না৷ আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে৷ পরবর্তীকালে সেটাই হল৷

- Advertisement -

ঘটনার পরের দিনই অর্থাৎ, ১৫ মার্চ কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়৷ এবং, মহামান্য আদালত এই ঘটনার তদন্তের ভার সিবিআই-এর হাতে তুলে দেয়৷ কোর্ট অর্ডারে একটা লাইন ছিল, সিবিআই-এর একজন জয়েন্ট ডিরেক্টর পদমর্যাদার আধিকারিক ঘটনাস্থল ঘুরে সেখান থেকে তথ্যপ্রমাণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগেই সংগ্রহ করবেন৷ দুপুর আড়াইটে নাগাদ নন্দীগ্রামে যাওয়ার জন্য নির্দেশ আসে৷ এ দিকে, তখনও আমাদের হাতে কোর্ট অর্ডার এসে পৌঁছয়নি৷ সেই সময় এখানে আমাদের জয়েন্ট ডিরেক্টর ছিলেন বি বি মিশ্র৷ তিনি আমাকে নন্দীগ্রামে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেন৷ বিষয়টি দিল্লিতে আমাদের সদর দফতরে জানানো হয়৷ আমি শুধু জয়েন্ট ডিরেক্টরকে কোর্ট অর্ডারটা হাতে পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার জন্য অনুরোধ করেছিলাম৷

যদিও, ইতিমধ্যেই আমি সেন্ট্রাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে (সিএফএসএল) বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছিলাম৷ কারণ, সংগৃহীত প্রয়োজনীয় নমুনা তারাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে৷ দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ হাইকোর্টের অর্ডারের কপি আমাদের হাতে এসে পৌঁছয়৷ তত ক্ষণে সিএফএসএল-এর আধিকারিকরাও চলে এসেছেন৷ বিকেল পাঁচটা নাগাদ জয়েন্ট ডিরেক্টরের নেতৃত্বে আমরা নন্দীগ্রামের দিকে রওনা দিলাম৷ প্রথমেই আমরা গিয়েছিলাম তমলুক হাসপাতালে৷ কারণ, নন্দীগ্রামে যেতে যেতেই আমরা খবর পাচ্ছিলাম, বেশ কয়েকটি মৃতদেহ এবং বহু আহত মানুষকে ওই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷
তমলুক হাসপাতালে পৌঁছে, প্রথমেই সেখানকার সুপারের সঙ্গে দেখা করে আমাদের পরিচয় দিয়ে কোর্ট অর্ডারের কপি দেখালাম৷ কপি দেখে তিনি হাসপাতালের এক কর্মীকে ডেকে বললেন, ওই কর্মী যেন আমাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেন৷ সেই কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমেই আমরা গেলাম হাসপাতালের মর্গে৷ সেখানে পর পর পড়ে ছিল ছ’-সাতটি মৃতদেহ৷ মৃতদের মধ্যে দু’জন ছিলেন মহিলা৷ আর, অন্যরা পুরুষ৷ অধিকাংশ মৃতদেহেই ছিল ‘বুলেট ইনজুরি’৷ কোনও কোনও মৃতদেহে ছিল ধারাল অস্ত্রের আঘাত৷ বেশ কয়েকটি মৃতদেহে গুলি লেগেছিল পিছনের দিক থেকে৷

মৃতদেহগুলি পরীক্ষা করে আমরা হাসপাতালের ওয়ার্ডের ভিতরে গেলাম৷ সেখানে সারি দিয়ে শুয়ে ছিলেন আহত বহু মানুষ৷ তাঁদের সংখ্যা ৪০-এর কাছাকাছি৷ আহত ওই সব মানুষের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানলাম, কীভাবে তাঁরা জখম হয়েছেন৷ তখন রাত প্রায় সাড়ে তিনটে বেজে গিয়েছিল৷ হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম হলদিয়ায়৷ উদ্দেশ্য ছিল কিছুটা সময় গা এলিয়ে দেওয়া৷ কিন্তু, বিছানায় শুয়েও ঘুম আসছিল না৷ কারণ, পরের দিনের ‘প্রোগ্রাম’টা মনে মনে সাজিয়ে নিচ্ছিলাম৷
প্রায় কাকভোরে আমরা বিছানা ছাড়লাম৷ জয়েন্ট ডিরেক্টরের নির্দেশে আমাদের গোটা দল দু’ ভাগে ভাগ হয়ে গেল৷ জয়েন্ট ডিরেক্টরের নেতৃত্বে একটা দল গেল নন্দীগ্রাম৷ আর, আমার নেতৃত্বে একটা দল গেল ভাঙাবেড়িয়ার দিকে৷ দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম, ভাঙাবেড়িয়ার একটি ব্রিজের কাছে পুলিশের একটি দল দাঁড়িয়ে আছে৷ কাছাকাছি আসতেই আমাদের দিকে এগিয়ে এল তারা৷ এই দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার এক আধিকারিক৷ ব্রিজের কাছে রাস্তার উপরে পড়ে ছিল প্রচুর চপ্পল৷ ইতিমধ্যেই দেখি একটা বড় মিছিল আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে৷ মিছিল থেকে কিছু লোক এগিয়ে এসে আমাদের পরিচয় জানতে চাইলে, পরিচয় দিয়ে তাঁদের জানালাম যে, কোর্টের নির্দেশে আমরা তদন্ত করতে এসেছি৷ সেদিন তাঁদের সহযোগিতা আমাদের খুব কাজে এসেছিল৷

তাঁদেরই সাহায্যে আমরা সেখানে পড়ে থাকা কিছু বুলেটের খোল এবং হাওয়াই চপ্পল সংগ্রহ করলাম৷ এর পর সন্ধে হয়ে গেলে সেখান থেকে ফিরে এলাম হলদিয়ায়৷ সেই রাত আমরা একটি সরকারি গেস্ট হাউসে কাটিয়েছিলাম৷ পরের দিন ফের আমাদের জয়েন্ট ডিরেক্টর গেলেন নন্দীগ্রাম৷ আর, আমি গেলাম গোকুলনগর৷ সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ পৌঁছে দেখলাম, প্রচুর সাংবাদিক উপস্থিত হয়েছেন সেখানে৷ গোকুলনগরে আমাদের পরিচয় পেয়ে বেশ কয়েকজন স্থানীয় মানুষ এগিয়ে এলেন৷ দুপুর যখন প্রায় দেড়টা, তখন সোর্স মারফৎ একটা খবর পেলাম যে, জননী ইটভাটায় বেশ কিছু সশস্ত্র দুষ্কৃতী লুকিয়ে আছে৷ খবরটি যাচাই করার পর আমাদের সোর্স বলল যে, ওখানে বেশ কিছু অস্ত্রও জড়ো করে রাখা হয়েছে৷ আমরা ইটভাটার দিকে রওনা হলাম৷

ওই ইটভাটার কাছে পৌঁছে দেখলাম, সেখানে তিনটি ঘর৷ সামনের দিকের ঘরে বারান্দা আছে৷ সেই বারান্দায় দু’জন লোক লুঙ্গি পড়ে বসে নজরদারি চালাচ্ছিল৷ আমাদের দেখে একজন পালানোর চেষ্টা করলে, ছুটে গিয়ে আমরা ওই লোকটিকে ধরে ফেলি৷ তত ক্ষণে অন্য লোকটিকেও ধরে ফেলেছেন আমাদের দলের সদস্যরা৷ হাতের কাছে কিছু না পেয়ে, পড়ে থাকা গামছা দিয়েই এই দু’জনের হাত আমরা বেঁধে দিই৷ এর পর প্রথম ঘরে ঢুকে দেখি, সেখানে দু’টি রাইফেল পড়ে আছে৷ একটি সিঙ্গল ব্যারাল, আর, অন্যটি ডবল ব্যারাল৷ প্রাইভেট সিকিওরিটি গার্ডরা যে ধরনের রাইফেল ব্যবহার করেন, সেই রকম৷
এর পর আমরা এই প্রথম ঘরটির লাগোয়া পরের ঘরটিতে ঢুকলাম৷ দেখলাম, ঘরের মেঝেয় প্রচুর গোলাগুলি পড়ে আছে৷ আর, সে সবের সঙ্গে রয়েছে একটি রিভলবার এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি প্রচুর পিস্তল৷ প্রায় নিঃশব্দেই আমরা সে সব বাজেয়াপ্ত করলাম৷ কারণ, আমাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল যে, পাশের অর্থাৎ, তৃতীয় ঘরে কিছু লোকজন আছে৷ এই ঘরের দরজা ভিতর দিক থেকে ভেজানো ছিল৷ ইশারায় আমি সবাইকে সতর্ক থাকতে বললাম৷

জোরে একটি ঠেলা মারতেই হাট করে খুলে গেল দরজা৷ একরকম প্রায় হুড়মুড় করেই আচমকা আমরা ঘরের ভিতর ঢুকে পড়লাম৷ দেখলাম, চারজন লোক মেঝের উপর শুয়ে আছে৷ আমাদের ঢুকতে দেখে ওরা উঠে পড়ার চেষ্টা করলেও সফল হয়নি৷ তার আগেই আমরা ওদের ধরে ফেলি৷ আমাদের পরিচয় পেয়ে ঘাবড়ে গিয়েছিল ওরা৷ খানাতল্লাশিতে ঘর থেকে পাওয়া গেল বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র, সঙ্গে প্রচুর গুলি৷ এর বাইরে আমরা যেটা পেয়েছিলাম, সেটা হল বারুদ ভর্তি চটের বস্তা৷ এদেরকে অনুসন্ধান করে আমরা একটি নামের তালিকা পাই৷ সেই তালিকায় লেখা ছিল যে, কোন কোন ব্যক্তির ঘরে কবে এবং কোন সময় হামলা চালানো হবে৷

বুঝতে পারছিলাম এদের সঙ্গীরা আশপাশে কোথাও আছে৷ ঝুঁকি না নিয়ে আমরা খবর পাঠালাম স্থানীয় খেজুরি থানায়৷ সেখান থেকে কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশের একটি বড় দল চলে আসে৷ আমি বিস্তারিতভাবে বিষয়টি জানালাম আমার উপরের অফিসারদের৷ এর পর তাঁদের নির্দেশ অনুযায়ী খেজুরি থানায় সমস্ত কিছু আমরা জমা দিয়ে দিই এবং একটি সিজার লিস্ট তৈরি করি৷ এই সাফল্যে আমরা সকলেই খুশি হয়েছিলাম৷ আরও একটি বড়সড় দুর্ঘটনা আটকে দিতে পেরেছিলাম৷ ক‌’ দিন বাদেই এই মামলার তদন্তভার দিয়ে দেওয়া হয় সিবিআই-এর স্পেশাল ক্রাইম ব্রাঞ্চকে৷

গো-খাদ্য কেলেঙ্কারি এবং ভোপাল গ্যাস লিকের তদন্তেও যুক্ত ছিলেন সিবিআই-এর প্রাক্তন এই আধিকারিক৷

অনুলিখন: বিভাস ভট্টাচার্য৷