সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: বর্ষীয়ান বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি সম্প্রতি উপলব্ধি করতে পেরেছেন বর্তমানে বিজেপি যেভাবে চলছে তা ঠিক নয় ৷ মোদী-অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন বিজেপির আচরণ দেখে তাঁর অভিমত প্রকাশ করেছেন নিজের ব্লগে৷ ওই ব্লগে তিনি বার্তা দিয়েছেন, জাতীয়তাবাদ নিয়ে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে তা ঠিক নয় কারণ এখন বিজেপি বিরোধীদের দেশদ্রোহী তকমা দিচ্ছে ৷

কিন্তু আদবানির অতীত আচরণের সঙ্গে আদৌ খাপ খাচ্ছে তো বর্তমান উপলব্ধি ? যেমন পাকিস্তানের জন্মলগ্নের সময় হঠাৎ জিন্নার মধ্যেও এক বিপরীত উপলব্ধি দেখা গিয়েছিল যা তাঁর অতীত আচরণের থেকে একেবারে আলাদাই ছিল ৷ মুসলমানদের সংগঠিত করা মহম্মদ আলি জিন্না পাক গণপরিষদে দেওয়া ভাষণে ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলেছিলেন৷ পাকিস্তানের জন্মলগ্নে তিনি বলেছিলেন- হিন্দু, মুসলমান সহ সব ধর্মের লোকেরাই স্বাধীনভাবে পাকিস্তানে নিজ নিজ ধর্মাচরণ করতে পারবেন৷ সেই কারণেই পাক জাতীয় পতাকায় সাদা অংশটি রাখা হয় সংখ্যালঘুদের জন্য৷

জিন্নার এই অবস্থান বিতর্কিত পাকিস্তানেই৷ ঠিক তেমনই ভারতে কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা আদবানির অবস্থানও বিতর্কিত৷ কয়েকদিন আগে বর্ষীয়ান এই বিজেপি নেতা আরও জানিয়েছিলেন – দেশ আগে , দল পরে তারও পরে ব্যক্তি৷ এর পরে প্রশ্ন ওঠে, তিনি সত্যিই কি এই ধ্যান ধারণায় বিশ্বাসী নাকি এই বয়েসেও আদাবানিজির মধ্যে ক্ষমতা লোভ বিরাজ করেছে ? এমন প্রশ্ন উঠছে কারণ মোদী-অমিত শাহ যোগসাজসে এবার আর ভোটে দাঁড়াতে পারছেন না নবতিপর লালকৃষ্ণ আদাবানি৷ ফলে এমন বার্তার মাধ্যমে যে সহানুভূতির হাওয়া তাঁর নিজের দিকে টেনে আনা উদ্দেশ্য তা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে৷

ফাইল ছবি৷

এই আদবানির রাজনৈতিক জীবনটা একেবারে ধোয়া তুলসী পাতা নয়৷ বরং বহুবারই তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে এবং তখন বিজেপি বিরোধীরা সেই সব ইস্যুতে লালকৃষ্ণ আদবানির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল৷ আজ অবশ্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে দুষতে বিরোধী শিবিরের অনেকেই আদবানির প্রতি সহানভূতিশীল৷

আশির দশক থেকেই লালকৃষ্ণ আদবানির নেতৃত্বে বিজেপির রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছিল রামজন্মভূমি৷ ১৯৯০ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙে রাম মন্দির গড়ার জন্য করসেবক উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের উজ্জীবিত করতে আদবানি রথযাত্রা শুরু করেছিলেন৷ যা গুজরাতের সোমনাথ মন্দির থেকে শুরু করে ভারতের নানা প্রান্ত ঘুরে বিহারে ঢুকলে সেই রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব রথ আটকে দেন৷ গ্রেফতার করা হয় আদাবানিকে৷ সেই রেশ ধরে শুরু হয় বিক্ষিপ্ত ধর্মীয় গোষ্ঠী সংঘর্ষ৷ দুবছর বাদে ১৯৯২ সালে আদবানির উপস্থিতিতেই করসেবকরা বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলে৷ যার ফলে দেশজুড়ে ফের ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল৷ এই ঘটনাতেও তাঁর বিরুদ্ধে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে৷

আবার ১৯৯৬ সালে জৈন হাওয়ালা কেলেঙ্কারিতে নাম জড়িয়েছিল লালকৃষ্ণ আদাবানির ৷ জৈনের ডায়েরিতে একাধিক নেতার নাম ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আদবানিও৷ ফলে ওই সময় তিনি পদত্যাগও করতে বাধ্য হন৷ পরে অবশ্য আদালত তাঁকে নির্দোষ বলায় তিনি ফের ভোটে দাঁড়িয়ে জেতেন৷ আবার ২০০২ সালে গুজরাতের ধর্মীয় গোষ্ঠী সংঘর্ষের জন্য তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কুর্সি থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী৷ বরং ওই সময় আদবানি কিছুটা নরম মনোভাব দেখিয়েছিলেন তাঁর শিষ্য মোদীর প্রতি৷ যদিও শেষমেশ তখন মোদীকে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিতে হয়নি৷

তাছাড়া সাংসদরা ঘুষ নিচ্ছেন, নারদা ভিডিও টেপে এমন কেলেঙ্কারির দেখেও সাংসদদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি আদবানি। গোটা বিষয়টা খতিয়ে দেখতে লোকসভায় এথিক্স কমিটি গড়া হয় এবং তার মাথায় রাখা হয় আদবানিকে৷ অথচ ওই কমিটি তেমন তৎপরতা দেখায়নি ফলে তেমন বৈঠকই করেনি কমিটি ৷ শুধু তাই নয় – মোদী জমানায় গত কয়েক বছর ধরেই গো- মাংসের নামে পিটিয়ে মারা সহ একাধিক ঘটনার কথা উঠে এলেও এই বর্ষীয়ান আদবানিকে আদৌ তেমন সরব হত দেখা যায়নি৷ অথচ এবার তিনি বার্তা দিলেন একেবারে আসন্ন লোকসভা ভোটের প্রাক্কালে৷

এটাও ঘটনা, দেশভাগের উত্তাল ক্রন্দন কোলাহলের মধ্যে দিয়ে চিরকালের জন্য ভারত ত্যাগ করে পাকিস্তানের গণ পরিষদের সদস্যদের সামনে সেদেশের জনক মহম্মদ আলি জিন্না ভাষণ দিয়েছিলেন৷ তাঁর আগে কয়েক বছর ধরে যেভাবে মুসলমানদের কথা তুলে ধরে জিন্না পাকিস্তানের দাবিতে সোচ্চার হতেন তাঁর সাপেক্ষে ওই বক্তৃতায় শোনা গেল এক ভিন্ন সুর ৷ অথচ ইতিমধ্যেই অনেক রক্তপাত হয়ে গিয়েছে স্বাধীনতার নামে দেশভাগের সময়৷

জিন্নার সেই বক্তৃতায় একটি অংশে ছিল- ‘‘আপনারা স্বাধীন৷ এই পাকিস্তান রাষ্ট্রে আপনারা নিজেদের ইচ্ছে মতো মন্দির মসজিদ অথবা অন্য কোনও উপাসনা স্থলে যাওয়ার অধিকার আপনাদের রয়েছে৷’’ কিন্তু এই যদি মনোভাব হয় তবে দেশভাগ হবে কেন হিন্দু ও মুসলমানদের থাকা নিয়ে? রক্তক্ষয়ী দেশভাগের জন্য যিনি অন্যতম দায়ী অথচ নতুন রাষ্ট্রের জন্ম প্রাক্কালে তিনিই ভিন্ন বার্তা দিচ্ছেন৷ যদি জিন্নার সত্যিই মনে হত হিন্দু মুসলমানের একসঙ্গে থাকা কোনও সমস্যাই নয় তাহলে তার আগের কয়েকটা বছর মুসলমানদের জন্য আলাদা স্বাধীন ভূখণ্ডের দাবিতে মুসলিম সমাজকে সংগঠিত করার দরকার হল কেন? সেই সময় যা যা করেছিলেন সেটা রাজনৈতিক উচ্চাশা পূরণের জন্যই, কারণ তিনি তো তখন একেবারে ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ বা ‘টু নেশন থিওরিতে’ বিশ্বাসী ৷ তখন তাঁর মনে হয়েছিল – হিন্দুদের জন্য হিন্দুস্তান এবং আলাদা ভূখণ্ডে মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান করা দরকার৷

ফাইল ছবি৷

আসলে জিন্না তো ব্যক্তিগত ভাবে একেবারেই ধর্মপ্রাণ ছিলেন না৷ চালচলন পোশাক থেকে খাদ্যাভ্যাস কোনও কিছুতেই তো তাঁকে ইসলামি ধর্মীয় রীতি ও মুসলমানদের মতো আচরণ দেখা যেত না৷ একেবারে ইংরেজি বলা ব্রিটিশ কায়দায় জামা কাপড় পড়তে দেখা যেত৷ মুসলমানদের কাছে শুয়োরের মাংস ধর্ম বিরোধী হলেও তিনি তা খেতেন৷ নিজ সম্প্রদায়ের কোন মেয়েকে বিয়ে না করে পার্সি মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন৷ কোনও ধর্মীয় গোঁড়ামির লেশমাত্র ছিল না তাঁর৷

অথচ সেই জিন্না ক্ষমতা লিপ্সার কারণে ধর্মকেই ব্যবহার করেছেন রাজনীতিতে৷ রাজনৈতিক উচ্চাশা পূরণের জন্য তাঁর একেবারে বিপরীতমুখী আচরণও দেখা গিয়েছিল৷ পাছে মুসলিম সমাজের কাছে তিনি জনপ্রিয়তা হারান তাই একমাত্র মেয়ে দিনা পার্সি বিয়ে করলে তিনি চরম বিরোধিতা করেন৷ আবার ভোটের সময় কাজের ছেলেটি শুয়োরের মাংস রান্না করে এনেছে শুনে আঁতকে ওঠেন এবং ছেলেটির মুখে হাত চাপা দিয়ে ফিসিফিসিয়ে বলেছিলেন- ওরে চুপ কর এমনটা করলে যে জমানাত জব্দ হবে৷

ধর্মকে বাজি রেখে পাকিস্তান গড়তে গিয়ে পরে জিন্না বুঝেছিলেন তিনি গোঁড়া মুসলিম সমাজের হাতের পুতুল হয়ে গিয়েছেন৷ তখন তিনি ধর্মনিরপেক্ষ পাকিস্তান গড়তে চাইলে তা কি করে সম্ভব৷ ফলে ওই ভাষণে যে বার্তাই থাকুক না কেন তা অলীক স্বপ্ন রয়ে গিয়েছিল৷ উল্টে পাকিস্তান ইসলামিক স্টেটে পরিণত হয়েছিল৷

বিজেপি করলেও আরএসএস প্রশিক্ষিত অন্যান্য দলনেতাদের সাপেক্ষে আদবানি তেমন গোঁড়া হিন্দু আদৌ নন৷ পাকিস্তানে সফর করে খোদ জিন্নার ধর্ম নিরপেক্ষতার স্তুতি করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন৷ আবার তিনিও জিন্নার মতোই ধর্মীয় কার্ড ব্যবহার করেছেন শুধুমাত্র রাজনৈতিক সাফল্যের উদ্দেশ্য৷ আজ অ-সহিষ্ণুতাকে টেনে এনে ভিন্ন বার্তা দিলেও তা শোনার মতো কেউ আছে তো ? বিজেপির সর্ব প্রবীণ মার্গ দর্শককে তাঁর শিষ্যরাই এক ঘরে ঢেলে দিয়েছে৷