স্টাফ রিপোর্টার, মালদহ: ছেলে ধরা সন্দেহে চার যাযাবর ও এক আদিবাসী মহিলাকে গণপিটুনি দিয়ে খুনের চেষ্টার অভিযোগ উঠল স্থানীয় গ্রামবাসীদের একাংশের বিরুদ্ধে । ঘটনার খবর পেয়ে এলাকায় পুলিশ যায় । কিন্তু ক্ষিপ্ত গ্রামবাসীদের হাতে নিগৃহীত হয় তদন্তকারী পুলিশ অফিসারেরা। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের একটি জিপ গাড়ি। বৃহস্পতিবার ঘটনাটি ঘটেছে মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুর থানার তুলসিহাটা গ্রামে ।

পরে উত্তেজিত জনতাকে থামাতে হরিশ্চন্দ্রপুর থানা থেকে বিশাল কমব্যাট ফোর্স এলাকায় পৌঁছায় । পুলিশী তৎপরতায় গণপিটুনি হাত থেকে উদ্ধার হয় ওই চারজন যাযাবর এবং আদিবাসী মহিলা। এরপর আক্রান্তদের কোনও রকমে হরিশ্চন্দ্রপুর থানায় নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য আহতদের পাঠানো হয় হরিশ্চন্দ্রপুর ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।

আরও পড়ুন : ‘ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে’ না বুঝে এখন মোদী-শাহের বাড়িতে ছুটছেন মমতা : দিলীপ

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, তুলসিহাটা গ্রামে এক সপ্তাহ আগে ২০ থেকে ২৫ জনের যাযাবরের একটি দল ফাঁকা মাঠে তাঁবু খাটিয়ে আশ্রয় নেয়। বিভিন্নভাবে তাবিজ-কবজ বিক্রি করা, কবিরাজি ওষুধ, গাছ গাছালির বিক্রি করে চলে ওইসব যাযাবরদের রোজগার। এদিন সকালে যাযাবর দলের ৪ জন পুরুষ এবং একজন মহিলা তুলসিহাটা গ্রামে তাবিজ-কবজ বিক্রির জন্য ফেরি করে বেড়াচ্ছিলেন।

সেই সময় কিছু মানুষের তাদের দেখে ছেলে ধরা হিসেবে সন্দেহ হয়। তারপরেই ওই পাঁচ জনকে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বাংলা-হিন্দি মেশানো ভাষা শোনাতেই সন্দেহ দানা বাঁধে গ্রামবাসীদের একাংশের। এরপর ওই যাযাবর দলের এই পাঁচজনকে খুঁটিতে বেঁধে গণপিটুনি দিতে থাকে গ্রামবাসীদের একাংশ।

এদিকে এই খবর জানাজানি হতেই শোরগোল পড়ে যায় গোটা তুলসিহাটা গ্রাম জুড়ে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় হরিশ্চন্দ্রপুর থানার পুলিশ। কিন্তু তদন্তকারী পুলিশ অফিসার, কর্মীদের ক্ষিপ্ত গ্রামবাসীদের হাতে নিগৃহীত হতে হয় বলে অভিযোগ। এমনকি ভাঙচুর করা হয় পুলিশের একটি গাড়িও। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে খবর পৌঁছায় হরিশ্চন্দ্রপুর থানায়। সেখান থেকে বিশাল কমব্যাট ফোর্স নিয়ে এলাকায় হাজির হন আইসি সঞ্জয় কুমার দাস। পুলিশি হস্তক্ষেপে ওই পাঁচজনকে উদ্ধার করা হয়।

আরও পড়ুন : পর্যটন দফতরের উদ্যোগ, পুজোর পরেই প্রতি জেলায় ট্যুরিজম ডেভলপমেন্ট বোর্ড

গ্রামবাসীদের একাংশের অভিযোগ, যাযাবর দলের ওই চার-পাঁচজন লোকজন গ্রামে কয়েকদিন ধরে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করছিলো। গেরুয়া বস্ত্র পরে তাবিজ-কবজ বিক্রি করে বেড়াচ্ছিলো। ছোট ছোট শিশুদের প্রতি নজর ছিল তাদের বলে অভিযোগ গ্রামবাসীদের৷ তুকতাক করে বাচ্চা চুরি করে নিতে পারে এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে ছিল গ্রামজুড়ে। তারই জেরে এদিন ওদের আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু ওদের মুখ থেকে অসংলগ্ন কথাবার্তা বের হতেই শুরু হয় গণপিটুনি।

পুলিশ জানিয়েছে, ওই যাযাবর দলটি ঝাড়খন্ড থেকে এসেছে। বিভিন্ন রাজ্য, জেলায় ঘুরে ঘুরে এরা নিজেদের রুজি রোজগার করে। তুলসীহাটা গ্রামের কেউ বা কারা হঠাৎ করে ছেলে ধরার গুজব রটিয়ে একটা বিশৃংখলার সৃষ্টি করতে চাইছিল। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।

তুলসিহাটা গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান শকুন্তলা সিংহ জানান, এই ধরনের গুজব যারা সমাজে ছড়ানোর চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ যাতে শক্ত হাতে ব্যবস্থা নিক৷ তবে গ্রামের মানুষের জন্য় পঞ্চায়েত থেকে নানা রকমভাবে সচেতনতামূলক প্রচার করা হচ্ছে।

হরিশ্চন্দ্রপুর থানার আইসি সঞ্জয় কুমার দাস জানিয়েছেন, ছেলে ধরার গুজবকে কারা ছড়ানোর চেষ্টা করছে, তা অবশ্যই তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এই ধরনের গুজবে যাতে গ্রামবাসীরা কান না দেন সে ব্যাপারেও গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রচার করা হচ্ছে । তবে এদিন যারা সরকারি কাজে বাধা দিয়েছে। পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করেছে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে গণপিটুনির ঘটনায় ওই পাঁচজনকে আপাতত উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।