অনেকবার অনেক দুর্যোগ ও বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি৷ প্রতি ক্ষেত্রে আমার ক্যামেরা সচল ছিল৷ সংবাদ মাধ্যমের চিত্রগ্রাহক হিসেবে দিনের পর দিন কাজ করতে গিয়ে মনে হয়েছে এসবই আমার পেশার অঙ্গ৷ তাই চিন্তা থাকলেও হাত নড়েনি একটুকুও৷ সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে গত কয়েকবছর আর কোনও যোগাযোগ নেই৷ তবে নেশাটা রয়েই গিয়েছে৷ আজ যখন ভয়াবহ সামুদ্রিক ঘূর্নিঝড় FANI আছড়ে পড়তে চলেছে, তাই উৎকণ্ঠা আর ভয় থাকলেও আমার ক্যামেরা চলবেই৷

নারায়ণ চৌধুরী:
( GMPR,হোটেল সানি বিজয়া)

পুরী শহরের এক কোনে ব্যস্ততম এলাকা ছাড়িয়ে আমার কর্মস্থল৷ যে হোটেলের জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্বে এসেছি কয়েকবছর হল৷ কাজে আকাজে হোটেলের বিশাল বারান্দা থেকে অল্প দূরে বিশাল বঙ্গোপসাগরের ঢেউ দেখতে দেখতে দিন কেটে যায়৷ সাগরের এলোপাথাড়ি হাওয়ায় নোনা গন্ধ এখন আমি অভ্যস্ত৷ এই কয়েকবছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে দেশের বিভিন্ন এলাকা৷

কিন্তু ওডিশার এই সৈকত শহরের উপর ঘূর্ণিঝড় তেমন আছড়ে পড়েনি৷ দিগন্তে মেঘ আর সাগর যেখানে মিশে যায় সেখানে প্রকৃতির রঙ আমার ক্যামেরায় ধরা পড়ে অবিরত৷ আজ পরিস্থিতি অন্যরকম৷ একটা ভয়াল সামুদ্রিক দানব গজরাচ্ছে৷ তারা আগমন কতটা ভয়াবহ আকার নিতে চলেছে তা আমার বোঝা অসাধ্য৷ কিন্তু ভয় একটা তাড়া করছে অবিরত৷ যদি সমুদ্র তীব্র ফুঁসে গিয়ে লক্ষ লক্ষ হাতির মতো দাপিয়ে চলে আসে৷ চিন্তা হচ্ছে বৈকি৷

২০০ কিলোমিটার গতিবেগ নিয়ে ঘূর্ণিঝড়টা আছড়ে পড়তে চলেছে ওড়িশার উপকূলে৷ ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের তরফে জারি হয়েছে সতর্কতা৷ গরমে ক্লান্ত, রোদে পুড়তে থাকা পুরী ও তার আশে পাশের সৈকত এলাকায় সকাল-বিকেল-সন্ধে নাগাদ পর্যটকদের সাগরে মাতোয়ারা খুবই সাধারণ বিষয়৷ কিন্তু ঝড়ের পূর্বাভাষে সেই সব বন্ধ৷ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন হোটেলে থাকা পর্যটকদের নিরাপদ এলাকায় সরে যাওয়ার নির্দেশ এসেছে৷ সেই মতো আমিও আমার হোটেলের গ্রাহকদের দূরে সরিয়ে দেওয়ার কাজে ব্যাস্ত৷ ঝড়ের অপেক্ষায় যেন ঝড়ের মতো সময় কাটছে৷

মূলত পশ্চিমবাংলা থেকেই বেশি দর্শক-পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে পুরীতে৷ আমাদের হোটলেও তেমনই অনেকে আছেন৷ প্রশাসনিক নির্দেশ পেয়ে দ্রুত তাঁদের এলাকা ছাড়তে বলে দেওয়ার পরেই খবর পেলাম ঝড়ের গতি বাড়ছে৷ মোবাইলের আপডেট মেসেজ জানিয়ে দিল আরও লাল চোখ নিয়ে ফুঁসতে ফুঁসে এগিয়ে আসছে FANI

কী হবে এরপর ? ঝড়ের দাপটে লণ্ডভণ্ড হবে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এই নগরী? জানি না৷ উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত৷ জনগণের মধ্যে একটা ভীতি কাজ করছে৷ নির্বাচন চলছে ওডিশা৷ লোকসভা ও বিধানসভা একইসঙ্গে হচ্ছে এই রাজ্যে৷ এই অবস্থায় FANI আছড়ে পড়তে চলল৷ ঘড়ির কাঁটা ধরে মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েকের নির্দেশে কাজ করছে রাজ্য প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় উদ্ধারকারী দল৷ বাড়ির লোকেরা চিন্তা করছে৷ আসছে বন্ধুদের ফোন৷ কী হয় কী হয় ভাব৷ সবাই চিন্তায়৷ কিন্তু আমাকে থাকতেই হবে৷

পাড় ভেঙে বিরাট বিরাট ঢেউ ইতিমধ্যেই আছড়ে পড়ছে আমাদের হোটেলের লাগোয়া বাগানের পাশে৷ আসছে FANI রাত জেগে সাগরের রুদ্র রূপ দেখতে মরিয়া আমি৷ তৈরি আমার ক্যামেরা৷ যতটা সম্ভব প্রোটেকশন নিয়ে হোটেলের বিরাট বারান্দা থেকে সাম্প্রতিক সময়ে সব থেকে বড় ঝড়ের রূপ আমি ক্যামেরায় বন্দি করব৷ ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক দানবের আগমন দেখতে পূরী শহরে থেকে গেলাম৷ ছবি তোলার নেশা বোধহয় এটাই৷

প্রশ্ন অনেক: দ্বিতীয় পর্ব