সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় , হাওড়া: বিদেশের স্কুলে এমন ভাবনা এখনও প্রয়োগ করা হয়েছে কি না তা জানা নেই। কিন্তু হাওড়ার গ্রামের এক স্কুল জল বাঁচাতে প্রয়োগ করেছে এক অভিনব পদ্ধতি। জল নষ্ট হওয়ার কোনও জায়গাই রাখছেন না। জমা জলকে আগে ব্যবহার করা হচ্ছে মিড ডে মিলের বাসন ধোয়া থেকে শুরু করে বিদ্যালয় পরিস্কার রাখার বিভিন্ন কাজে। সেই জলই আবার পানের যোগ্য করে তোলা হচ্ছে। জল বাঁচানোর এই অভিনভ পদ্ধতি প্রয়োগ করেছে আমতা-১ ব্লকের সোনামুই হরিসভা প্রাথমিক বিদ্যালয়।

গ্রামীণ হাওড়ার এই স্কুল ছাদে কিচেন গার্ডেন থেকে শুরু করে অভিনব কায়দায় বিদ্যালয়ের জন্মদিন পালন করে চমক দিয়েছে। উঠে এসেছে খবরের শিরোনামে। এবারে তাদের নয়া প্রচেষ্টা স্বল্প ব্যয়ে ‘Waste water treatment’। বিদ্যালয় কর্ত্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ছাদের কিচেন গার্ডেন,ফুলের বাগানে জল দেওয়ার জন্য ও মিড-ডে-মিলের বাসনপত্র পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে কিছুদিন আগেই পাতকুয়ো খনন করা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, সেটাকেই ‘waste water management’-এর অংশ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে সেই পদ্ধতি ? বিদ্যালয়ের ছাদে জমা বৃষ্টির জল,বেসিনের জল ও রান্নার বাসন ধোওয়ার জল মাটির নীচে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে প্রবেশের ব্যবস্থা করানো হয়েছে। এরপর সেই জল মাটির নীচে যাওয়ার পর বিশুদ্ধকরণ করা হচ্ছে। তারপর সেই জল চলে যাচ্ছে খনন করার পাতকুয়োয়। এই পদ্ধতি প্রয়োগ করতে ব্যবহার হয়েছে বড় আকারের ড্রাম।

এই অভিনব ভাবনা ভেবেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অরুণ খাঁ। তিনি বলেন , “এই পদ্ধতির ফলে মাত্র ২০ ফুটের গভীর পাতকূয়ায় সারা বছরের জলের জোগান পাওয়া যাবে। এই সমস্ত ছোটো ছোটো ভাবনার মধ্য দিয়ে পড়ুয়াদের মধ্যে সর্বোপরি সমাজের কাছে জল অপচয় সম্পর্কে বার্তা তুলে ধরতে আমরা সচেষ্ট। আমরা চাই আমাদের স্কুলের এই পদ্ধতি অর্থাৎ জলকে কীভাবে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয় সেটা জানুক। সাধারণ মানুষও ব্যবহার করুক। সবাই একসঙ্গে চেষ্টা করলে তবেই জল বাঁচানো সম্ভব।” তিনি জানিয়েছেন, “সমগ্র প্রকল্পটির জন্য খরচ হয়েছে ১২০০-১৫০০ টাকা।” এই পদ্ধতি নিজেদের স্বার্থে মানুষ ব্যবহার করতে পারে বলে মনে করছেন।

বিশিষ্ট পরিবেশবিদ,ড.সৌরভ দোয়ারী এই অভিনব প্রচেষ্টা প্রসঙ্গে বলেন , “পরিবেশ তথা তার সৃষ্ট সম্পদকে রক্ষা করতে এবং জল অপচয় রোধ করে তা পুর্নব্যবহারে এই উদ্যোগ শুধু একটি বিদ্যালয়েই নয় সমস্ত বিদ্যালয়েই চালু হোক। এটা শুরু , সবাই দেখে শিখুক তবে আমাদের বিন্দু বিন্দু থেকে সিন্ধু তৈরি করতে পারব, না হলে আমাদের বিপদ আরও বাড়বে বই কমবে না।”

সম্প্রতি ‘নীতি আয়োগ’ জানিয়েছে, ২০২০ সালের মধ্যে ভারতের ২১টি বড় শহরের ভূ-গর্ভস্থ জল একদম শেষ হয়ে যাওয়ার পথে। হাতে মাত্র এক বছরে কত কিছু শেষ হতে দেখবেন চোখের সামনে। নিজেও পস্তাবেন এক বোতল জলের জন্য। রাজস্থানে গরমকালে জল পাওয়া যায় না। সেই তালিকায় মহারাষ্ট্রও নাম লিখিয়েছে। সেখানে এমন এলাকারও দেখা মিলছে যেখানে পানীয় জল আনতে ট্রেনে করে ১৪ কিলোমিটার যেতে হচ্ছে মানুষকে। এই বছর সেই তালিকায় যোগ দিয়েছে চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, দিল্লি, গুরুগ্রামসহ আরও কয়েকটি শহর। আগামী কয়েক বছরে সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। শেষ দশ বছরে শেষ হয়েছে ভারতের ভূ-গর্ভস্থ জলের ৬১ শতাংশ। মনে করা হচ্ছে সাবধান না হলে খুব শীঘ্রই বাকি জল শেষ হয়ে যেতে পারে। নীতি আয়োগ বলছে, ভারতের ইতিহাসের সবথেকে সঙ্কটময় সময় এটা।