লিখলেন- অনিন্দিতা মাইতি নন্দী- এক্কেবারে ছোট্টবেলায় পড়েছিলাম, ”অজয় নদে এলো বান – জলে ভাসে সোনার ধান।” জলের তোড়ে কি করে সোনার ধান ভেসে যায়, তা ভেবে অবাক লাগতো। সেই ছোট্ট বেলার বইতে পড়া ‘অজয় নদ’ যে আমাকে টেনে বীরভূম অব্দি নিয়ে যাবে তা অবশ্য জানতাম না। আসলে বৈবাহিক সূত্রে অজয় নদের পার্শ্ববর্তী ‘দুবরাজপুর’ -এ আমার শ্বশুরবাড়ি। যতবার ওই অজয় নদের উপর দিয়ে যেতাম, ছোট্টবেলায় শেখা কবিতাটি বার বার মনে পড়ে যেত।

লিখলেন- অনিন্দিতা মাইতি নন্দী
লিখলেন- অনিন্দিতা মাইতি নন্দী

দুপাশে কাশফুলের সারি, ব্রীজের ওপর ট্রেন চলেছে ছুটে, অজয় নদের ওপর দিয়ে, পাশেই সেই বিখ্যাত ‘কেন্দুবিল্ব’ গ্রাম। এই গ্রামে প্রত্যেক বছরই – ‘মেলা’ বসে। এই ‘অজয় নদ’ কে নিয়েই যে রূপকথা-উপকথা রয়েছে,- প্রখ্যাত কবি জয়দেব এই ‘অজয় নদ’ -এর কদম্বখণ্ডীর ঘাটেই উন্মাদের মতো জলে ঝাঁপ দেন, জলের মধ্যে বার বার দুহাত বাড়িয়ে খুঁজতে থাকেন তার ইষ্টদেবতার মূর্তি।

বহুক্ষণ খোঁজার পর কবি জয়দেব অজয় নদের জলের তলদেশ থেকে তুলে আনেন রাধাশ্যামের যুগল মূর্তি। সেই রাধাশ্যামের যুগল মূর্তিকে কোলে করে জয়দেব তখন উন্মাদ নৃত্য শুরু করে দেন অজয় নদের তীরে। পরবর্তীকালে এই তরুণ জয়দেব আপন মনে শাস্ত্রচর্চা করে বাংলার কৃষ্টির ইতিহাসে রেখে গেলেন কালজয়ী কাব্য ‘গীতগোবিন্দ’।

কবি জয়দেব তাঁর আত্মপরিচয়ে পিতামাতার নামছাড়া সাংসারিক জীবনে কেবলমাত্র প্রিয়তমা পত্নী পদ্মাবতীর নাম লিখে গেছেন। জয়দেব -এর পিতা ভোজদেব ও মাতা বামাদেবী। কবি জয়দেব এর রচিত ‘গীতগোবিন্দ’ বাংলার জাতীয় জীবনের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ‘গীতগোবিন্দ’ এমনই এক কাব্য যেখানে আলংকারিকেরা বলেছেন আদিরস, – সংস্কৃত ভাষায় লেখা সর্বশ্রেষ্ঠ লিরিক কবিতা। বাংলার রসজগতে তাই কবি জয়দেব তাঁর অমরকাব্য ‘গীতগোবিন্দ’ রচনার মাধ্যমে মন্দার সৌরভে বিরাজমান।

রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার বর্ণনার মধ্য দিয়ে তাঁর অন্তরের যে বিশুদ্ধ নিবিড় প্রেম তা ফুটে উঠেছে। এমন রসাল কাব্য, তাই কাব্য জগতে প্রায় দুর্লভ। যুগের প্রয়োজনেই ‘যুগাবতার’ জন্ম নেন। তেমনি যুগের প্রয়োজনেই কালজয়ী কবি বা লেখকেরা তাদের কলমের মাধ্যমে যুগ পরিবর্তনে অংশ নেন।

বাংলায় তখন ঘোর অন্ধকার যুগ চলছে–রাজা বল্লাল সেন তখন বৃদ্ধ, তবুও এক তরুণী চণ্ডালরমনীকে নিয়ে তন্ত্র সাধনার নামে সংগোপন কামলীলায় মত্ত তিনি। ধৰ্ম তখন বিকৃত হয়ে সমাজের কাম-তৃষ্ণার সহায়তা করছে। তন্ত্র সাধনার নামে নারী উপাসনাকে কেন্দ্র করে সমাজে চরিত্রহীনতা ও যৌনলিপ্সা, সংক্রামক ব্যাধির মতো দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

পিতা বল্লালসেন এর ওপর অভিমান করে যুবরাজ লক্ষণসেন কিন্দুবিল্বের ‘সেনপাহাড়ী’ দুর্গে এসে বসবাস করতে লাগলেন। ঠিক এই সময়েই ‘অজয় নদ’ -এর তীরে ‘কেন্দুবিল্ব’ গ্রামে এক তরুণ যুবা আপনমনে কাব্যচর্চা করছিলেন। তিনি আর কেউ নন কবি জয়দেব। লক্ষণসেন -এর নামকে বাংলার কৃষ্টির ইতিহাসে অমর করে গেলেন এই অসামান্য প্রতিভাসম্পন্ন যুবক কবি ‘জয়দেব’ তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘গীতগোবিন্দ’ রচনার মাধ্যমে।

লক্ষণসেন বাংলার সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্পকলার পরিপূর্ণ বিকাশের মাধ্যমে এক উন্নতমানের জীবনাদর্শন প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করেন। লক্ষণসেন তাঁর রাজসভায় দেশের শ্রেষ্ঠ প্রতিভাদের স্থান দেন। এই রাজসভাতে কবি ‘জয়দেব’ -এর স্থান ছিল অগ্রগণ্য। বিক্রমাদিত্যের নবরত্নের মতো লক্ষণসেনের রাজসভাতেও কবি উমাপতি ধর, গোবর্ধন আচার্য, কবি শরণ, কবি ধোয়ী এবং কবি জয়দেব মিশ্র ছিলেন। এদের মধ্যে কবি জয়দেব -এর সাথেই আমরা পরিচিত।

সামাজিক জীবন এবং মানুষের অগ্রগতির ইতিহাস প্রকৃত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এক একটি যুগ কে সঠিক পথনির্দেশ করতে যেমন এক একজন মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটে তেমনি ভাবে এক একটি বই তাঁর মধ্যেকার আলো, শক্তি দিয়ে মানুষকে সঠিক মনোবল যোগায় এগিয়ে যেতে। বাংলার মানুষ যখন ইন্দ্রিয় আসক্তির নির্লজ্জ উচ্ছাসে ডুবে যেতে বসেছিল তখন কবি জয়দেব তার অমরকাব্য দিয়ে সঙ্গীত ঝংকারে নিঃশব্দে নিয়ে এলেন প্রেমের বাণী।

পিপাসার্ত মানুষের জীবনে নিয়ে এলেন কাব্যসুধা। গীতগোবিন্দের শ্লোকগুলি বীনার ঝংকারের মতো, কোথাও বা নুপুরের নিক্কনের মতো, প্রাণের সুরের সাথে বাঁধা। ‘জয়দেব’ একান্ত প্রেমের যে সাধনা করে গেছেন তাই ফুটে উঠেছে রাধাকৃষ্ণের প্রেমে। যার ফলে পরবর্তী যুগে সেই প্রেম সাধনাকে মহাপ্রভু চৈতন্যদেব মানবধর্মের রূপ দেন।

বৈষ্ণব মতানুযায়ী, ভগবান বাঁধা একমাত্র রাধা-প্রেম দিয়ে। ঈশ্বর:পরম:কৃষ্ণ – অর্থাৎ সেই ঈশ্বরকে, সেই পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণকে পাবার একমাত্র পথ হলো প্রেমবিভোর।সেই প্রেমবিভোর হয়ে সাধনার দ্বারা চিত্তশুদ্ধির পথে আত্মহারা হয়ে কবি জয়দেব লেখেন অমরকাব্য লেখনী গীতগোবিন্দ। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা সেই কাব্যের মূল বিষয়। এই কাব্যগ্রন্থে মোট ১২টি সর্গ রয়েছে।

প্রথম সর্গ হল সামোদ দামোদর এবং শেষ সর্গ সুপ্রীত – পীতাম্বর। মোট ২৮৬টি শ্লোক এবং ২৪টি গীত রয়েছে। বাংলা ভাষায় বৈষ্ণব পদাবলীর সূচনা কবি ‘জয়দেব’ -এর ‘গীতগোবিন্দ’ -এর পদাবলী থেকেই বলে মনে করা হয়। এই কাব্যে মূলত বৃন্দাবনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের গোপিনীদের সাথে রাসলীলা এবং সেই কারণে রাধার যে বিরহ-বিষাদ উন্মাদনা, রাধার কৃষ্ণকে পাবার জন্য যে আকুলতা, শ্রীকৃষ্ণের রাধার জন্য যে প্রবল এক উৎকন্ঠা খুবই প্রাঞ্জল লেখনীতে জয়দেব বর্ণনা করেছেন।

কবি জয়দেব অজয় নদের তীরে তাঁর নব পরিণীতা বধু পদ্মাবতীকে নিয়ে এক অপরূপ প্রেম সাধনা শুরু করেন, দিনের সারাক্ষণই চলে রাধাশ্যামের অর্চনা, সঙ্গে পদ্মাবতী রাধাশ্যামের আরতি করেন সংগীত নৃত্য করে। কবি জয়দেব সারাক্ষণ আচ্ছন্ন হয়ে থাকেন কৃষ্ণ-চিন্তা, কৃষ্ণ কথাতে।

তাঁর অন্তরের নিবিড় আকুতি, অনুভূতি হয়ে ফুটে ওঠে তাঁর লেখনীতে। সন্ধ্যারতির সময় পদ্মাবতীর বিভোর হয়ে নৃত্য নিবেদন রাধাশ্যামের বিগ্রহের কাছে যেন মনে হয় স্বয়ং শ্রীরাধিকা নৃত্য করছেন কৃষ্ণপ্রেমে। আবেশে কবি জয়দেবের অজয় নদকে মনে হয় যমুনা, অজয় নদের তীরে কদম্ববৃক্ষকে দেখে তাঁর মনে হয় কেলিকদম্ব। আস্তে আস্তে জয়দেব তাঁর নিজের মনে রচনা করে নেন নববৃন্দাবন।

কবি পত্নী পদ্মাবতীর প্রেমের মধ্যেই তিনি নতুন করে খুঁজে নেন রাধা কৃষ্ণের অনন্ত প্রেমলীলা। জয়দেব রচনা করতে বসেন ‘গীতগোবিন্দ’ এখানে শ্রীকৃষ্ণ বিলাসরসে রসিক কিশোর নায়ক, সেই কিশোর নায়কের অপূর্ব মোহন মূর্তি। চন্দ্রাবলীর কুটিরে লীলা সমাপ্ত করে কৃষ্ণ এসেছেন শ্রীমতির কুঞ্জে। নিদারুন অভিমানে কৃষ্ণ অভিমানিনী শ্রীরাধিকা, স্বয়ং রাধামাধব তাঁর মানভঞ্জনের জন্য সংকল্প করেন নিজেকে সম্পূর্ণভাবে শ্রীমতীর চরণে আত্মসমর্পণ করার।

সমস্ত বিশ্ব যাঁকে চায় তিনি নিজে নতজানু শ্রীমতির চরণে। কেঁপে ওঠে কবি জয়দেব এর লেখনী। কবি জয়দেব অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। অশ্রুজলে ঝাপসা হয়ে ওঠে পুঁথির অক্ষর। জগতের সব প্রাণী যাকে আকুল ভাবে চায় সেই পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ আজ ব্যাকুল হয়ে, চাইছেন শ্রীরাধিকা চরণ! কবি জয়দেব লিখলেন,- ”স্মরগরলখন্ডনং মম শিরশি মন্ডনং” -এ পর্যন্ত লিখেই উদ্বেলিত হয় কবির হৃদয় কিভাবে লিখবেন কেমন করে লিখবেন সেই কথা, সারা বিশ্ব যার চরণে প্রণিপাত করে তিনি আজ চাইছেন শ্রীমতিচরণ ধরতে?

পরের কাহিনীটুকু ইতিহাস- কারণ কবি জয়দেব স্নানে গিয়ে ফিরে আসার পর দেখেন ‘গীতগোবিন্দ’ -এর পুঁথিতে সেই অসমাপ্ত অংশের পর স্পষ্ট লেখা রয়েছে, ‘দেহি পদপল্লবমুদারম।’ ভক্তের আকুল আহ্বানে সেদিন স্বয়ং ভগবান – সশরীরে এসেছিলেন অজয়ের তীরে, নিজ হাতে লিখে গেলেন মহাকাব্যের মধ্যে তাঁর চিহ্ন। তাই ‘গীতগোবিন্দ’ স্বতন্ত্র একটি কাব্য।

গীতায় স্বয়ংভগবান বলে গেছেন আত্ম সমর্পন যোগের কথা, যেখানে তাঁর শরণ নিলেই তাঁকে পাওয়া যায়। তার জন্যে কোনো কঠোর তপস্যা বা যজ্ঞ করতে হয় না। এই আত্মসমর্পন যোগ অত্যন্ত কঠিন। একমাত্র নিষ্কাম ভালোবাসাই ভালোবাসা, শ্রীকৃষ্ণের জন্যই কৃষ্ণপ্রীতির দ্বারা ভগবানকে পাওয়া যায়। বৈষ্ণব কবি জয়দেব তাই পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ সঙ্গে মিলনের, তাঁকে পাওয়ার জন্যই দেহগত মিলন বিরহ প্রকাশকেই প্রতীকরূপে গ্রহণ করেছেন। নিজের জীবন দিয়ে জয়দেব যে প্রেম সাধনা করেছেন, তাঁরই প্রকাশ হল গীতগোবিন্দ। সেই অনন্ত প্রেমসাধনাকে পরবর্তীকালে মানবধর্মে পরিণত করেন মহাপ্রভু চৈতন্যদেব।

রচনা সূত্র (Reference):
1.চিত্রে জয়দেব ও গীতগোবিন্দ, শ্রী নৃপেন্দ্র কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, দেব সাহিত্য কুটীর, কলকাতা
2.বঙ্গভূমিকা-সুকুমার সেন
3. ছবি:আন্তর্জাল (Internet) থেকে সংগৃহিত।

প্রশ্ন অনেক-এর বিশেষ পর্ব 'দশভূজা'য় মুখোমুখি ঝুলন গোস্বামী।