সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : তিনি ছিলেন ছাপোষা এক গৃহী মানুষ। এক অদ্ভুত টানে হয়ে যান পরিবার ছাড়া। তারপর আর কোনওদিন ফেরেননি পরিবারে। তন্ত্র সাধনা ও সন্ন্যাস জীবনে খ্যাতি লাভ করেছেন বই লিখে। হয়ে উঠেছেন সাহিত্যিক। তাঁর লেখা গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে বিখ্যাত সিনেমা। তিনি দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, ছদ্মনাম অবধূত। আজ তাঁর মৃত্যুদিন।

কলকাতার ভবানীপুরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম দুলালচন্দ্রের। ছেলে অমল মুখোপাধ্যায়ের জন্মের পর প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যু হয়। এরপরেই সংসার ত্যাগ করেন তিনি। অজানা রহস্যলোক তাঁকে নাকি টানত। সেই টানে ঘর ছাড়েন দুলালচন্দ্র। বয়স তখন মেরেকেটে আঠাশ। উজ্জ্বয়িনীর মহাকাল মন্দিরে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। সন্ন্যাসজীবনে তাঁর নামকরণ কালিকানন্দ অবধূত। তারপর প্রায় কুড়ি বছর ধরে তাঁকে সেই আকর্ষণই টেনে নিয়ে বেরিয়েছে ভারতবর্ষের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে, এমনকি বৃহত্তর ভারতেও। হিমালয় থেকে কুমারিকার ভেতর কোনও তীর্থ নেই-যা তিনি যাননি। সেই সময়ই ইনি বেলুচিস্তানের পশ্চিমপ্রান্তে হিন্দুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থ ‘হিংলাজ’ ভ্রমন করেন। সে পথ অতি দুর্গম, মরুভূমি অতিক্রম করে যেতে হয়েছে। পথ যেমন বিপদশঙ্কুল। তবু তিনি পৌঁছে যান হিংলাজ মাতার দ্বারে।

সেই যাত্রা নিয়েই ১৯৫৪ সালে মরুতীর্থ হিংলাজ নামক উপন্যাস রচনা করেন এবং খ্যাতি অর্জনের শুরু। অপর বিখ্যাত গ্রন্থ উদ্ধারণপুরের ঘাট (১৯৬০)। অবধূত লিখতে শুরু করেছেন প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে। প্রথম বই ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। অবধূতের সাহিত্যিক হিসাবে আত্মপ্রকাশ পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে। এরপর থেকে আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হয়নি। যাই লিখেছেন সোনা হয়ে গিয়েছে। তবে মরুতীর্থ হিংলাজ তাঁর লেখা সেরা বই।

এটি মূলত একটি আত্মজীবনীমূলক কাহিনি। পাকিস্তানে বেলুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত মরু এলাকা ‘হিংলাজ’ হিন্দুদের একটি তীর্থস্থান; ৫১ শক্তিপীঠের এক পীঠ। মন্দিরের নামেই গ্রামটির নাম হিংলাজ৷ বাংলা, হিন্দি, অসমীয়া ও সিন্ধি ভাষায় দেবীর নাম হিংলাজ হলেও মূল সংস্কৃত শব্দটি হলো ‘হিঙ্গুলা’। হিংলাজের তীর্থযাত্রীরা সেকালে যেতেন উটের পিঠে চড়ে৷ যাত্রা শুরু হত করাচি শহরের কাছে হাব নদীর ধারে৷ সঙ্গে থাকত এক মাসের রসদ, যেমন শুকনো খাবার, মরুদস্যুদের প্রতিরোধ করার জন্য অস্ত্র, পানীয় জল ইত্যাদি৷ এছাড়া সঙ্গে থাকত হিংলাজ মাতার প্রসাদের জন্য শুকনো নারকেল, মিছরি, বাতাসা ইত্যাদি৷ এক মাসের অত্যন্ত কঠোর যাত্রার পর শ্রান্ত তীর্থযাত্রীরা পৌঁছতেন হিংলাজে৷ অঘোর নদীতে স্নান সেরে তারা দর্শন করতে যেতেন হিংলাজ মাতাকে৷ এই মন্দির স্থানীয় বালুচ মুসলমানদের কাছেও পরম আদরণীয়৷ তাদের কাছে এটি ‘নানি কী হজ’ নামে পরিচিত। হিংলাজের মন্দিরটি একটি গুহার মধ্যে অবস্থিত৷ এটি আসলে একটি অগ্নিকুণ্ড। অগ্নিজ্যোতিকেই হিংলাজদেবীর রূপ বলে মানা হয়।

বাঙালী ঔপন্যাসিক কালিকানন্দ অবধূত-রচিত ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ এবং ‘হিংলাজের পরে’ উপন্যাস-দুটিতে হিংলাজ ও কোটেশ্বর তীর্থদ্বয়ের বিস্তৃত ও অনুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে। বইটি কেবল হিংলাজে গমনাগমনের কাহিনী নয়, এতে আছে একজন সংসারবিরাগী মানুষের জীবনদর্শন। এই উপন্যাসটি অবলম্বনে ১৯৫৯ সালে একটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়, যার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন বিকাশ রায় ও উত্তমকুমার।

আটষট্টি বছর বয়সে, ১৯৭৮ সালে সন্ন্যাসি সাহিত্যিকের মৃত্যু হয়। সাকুল্যে লেখার জন্য সময় পেয়েছেন তেইশ বছর। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ মিলিয়ে লিখেছেন প্রায় সমসংখ্যক, অর্থাৎ খান তেইশ-চব্বিশ গ্রন্থ।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.