তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: ন্যুনতম খরচে কম্পিউটারের ব্যবহার ছাড়াই, আলো ও লেন্স ব্যবহার করে ‘ডিজিট্যাল’ ক্লাসোপযোগী ‘প্রজেক্টর’ তৈরী করে শোরগোল ফেলে দিয়েছে, বাঁকুড়ার সোনামুখী বি.জে হাই স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণীর বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সায়ন চট্টোপাধ্যায়।

সম্প্রতি তার এই অভিনব আবিস্কার নিয়ে, বাঁকুড়া জেলাশাসক ডাঃ উমাশঙ্কর এসের কাছে হাজির হয় সে। এই বিষয়ে অতিউৎসাহী জেলাশাসক ডাঃ উমাশঙ্কর এস প্রতিশ্রুতিমান এই ছাত্রটিকে, তার কাজে সমস্ত ধরণের সাহায্য সহযোগীতা করার কথা জানিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।

বর্তমান সময়ে যখন প্রশাসনের তরফে ‘ডিজিট্যাল ক্লাস রুম’ তৈরীর ভাবনা চলছে, তখন নামমাত্র খরচে এই ছাত্রের আবিস্কার জেলা জুড়ে বিশেষ আগ্রহের বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজিট্যাল ক্লাস রুম তৈরীর জন্য যেখানে ন্যুনতম লক্ষাধিক টাকার প্রয়োজন, তখন এই ক্ষুদে আবিস্কারকের প্রজেক্টরটি মিলবে মাত্র ৭ থেকে ১০ হাজারের মধ্যে। এই প্রজেক্টর ব্যবহার করে দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমে বড় পর্দায় নিমেষের মধ্যে সব ছবি, লেখা দেখা বা পড়া যাবে। তথ্যভিজ্ঞ মহলের মতে, সায়ন চট্টোপাধ্যায়ের এই আবিস্কার আগামী দিনে সারা রাজ্য জুড়ে ‘ডিজিট্যাল ক্লাসে’র ভাবনাকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করবে। আর তার জন্য চাই তার নবতম আবিস্কারের সামান্য ‘আপগ্রেড’ ও তার ডিভাইসের ‘পেটেন্ট’ পাওয়া। প্রশাসনিক সাহায্য পেলে যা অতিসহজেই মিলবে বলে অনেকে মনে করছেন।

সোনামুখী শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যানার্জী পাড়ার বাসিন্দা সায়ন চট্টোপাধ্যায় বছর সাত আগে এক দূর্ঘটনায় তার বাবাকে হারায়। তখন থেকে মা-ই তার পৃথিবী। সায়ন চট্টোপাধ্যায়ের এই সাফল্যে খুশি তার মা মল্লিকা চট্টোপাধ্যায় থেকে স্কুলের শিক্ষক, সহপাঠী, পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন থেকে সোনামুখী পৌরসভার চেয়ারম্যান সুরজিৎ মুখোপাধ্যায় সহ সকলেই।

ছেলের জন্য গর্বিত মা মল্লিকা চট্টোপাধ্যায় বলেন, ছোটো থেকেই নিত্য নতুন আবিস্কারের প্রতি ওর ঝোঁক। কোন কিছু ওর চাপিয়ে না দিয়ে আমি বরাবর চেয়েছি ও নিজের মতো বড় হোক। ছেলের আবিস্কার প্রসঙ্গে বলেন, জেলাশাসক পেটেন্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে ছেলে আগামী দিনে পড়াশুনার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য পেলে তাঁর খুব সুবিধা হয় বলেও তিনি জানিয়েছেন।

সহপাঠিনী নবমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ক্লাস ফাইভ থেকে আমরা একসাথে পড়াশুনা করছি। সায়ন আমার খুব ভালো বন্ধু। ও একজন বিজ্ঞানী হতে চায়। আর যদি সে হতে পারে তবে বন্ধু হিসেবে নবমিতা খুব খুশি হবে বলেই জানিয়েছে।

ছাত্রকে নিয়ে গর্বিত সোনামুখী বি.জে হাইস্কুলের শিক্ষকরাও। প্রধান শিক্ষক মনোরঞ্জন চোংরে বলেন, প্রথম থেকেই মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত সায়ন চট্টোপাধ্যায়। নয়া অবিস্কার আমাকে স্কুলে এনে দেখায়। ওর এই আবিস্কার স্মার্ট ক্লাসের বিকল্প হিসেবে দারুণ কাজ দেবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

সোনামুখী পৌরসভার চেয়ারম্যান সুরজিৎ মুখোপাধ্যায় তার শহরের এই ছাত্রের সাফল্যে যথেষ্ট গর্বিত বলে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে পৌরসভার তরফে তাকে নাগরিক সম্বর্ধনা ও সাধ্যমতো আর্থিক সাহায্য করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এই বিষয়ে আবিস্কারক ছাত্র সায়ন চট্টোপাধ্যায় বলে, আমার মতো অনেকেই আছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে অত্যাধুনিক ডিজিট্যাল ক্লাস রুম যুক্ত কোচিং এ পড়াশুনা করার সামর্থ্য নেই। কিন্তু বোর্ডে লিখে বোঝানোর চেয়ে পর্দায় দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমে বোঝালে বিষয়টা অতি সহজেই ছাত্র ছাত্রীদের স্পষ্ট হয়। তার তৈরী প্রজেক্টরে কোনও স্ক্যানার বা কম্পিউটারের প্রয়োজন হয়না জানিয়ে সে বলে, এর মাধ্যমে টু ডি ও থ্রীডি দুই পদ্ধতিতেই বড় পর্দায় যেকোনও ছবি বা বইয়ের পৃষ্ঠা দেখানো সম্ভব।

জেলাশাসক ডাঃ উমাশঙ্কর এস তার এই কাজে আর্থিকভাবে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জানিয়ে সে আরও বলে, আগামী দু’মাসের মধ্যে এই কাজ শেষ করে সে তাঁর দফতরে জমা দেবে। তার এই কাজের পিছনে বাড়ির সবার পাশাপাশি স্কুল ও স্কুলের শিক্ষকদের অবদান সব থেকে বেশী বলেই সে জানিয়েছে।