দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন ভারতের নৌবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান, অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল এল রামদাস৷২০০২ সালে গুজরাত দাঙ্গার সময়েও তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়িকে এমনই একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন তিনি৷Kolkata 24×7-এ তাঁর এবারকার খোলা চিঠিটির (২২ অক্টোবর, ২০১৫) বাংলা তর্জমা তুলে দেওয়া হল৷

 সম্মাননীয় রাষ্ট্রপতি এবং সম্মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে আমি এই খোলা চিঠি লিখতে বাধ্য হচ্ছি, কারণ আমাদের প্রিয় দেশ ও দেশের মানুষের পারস্পরিক আদানপ্রদানের ঐতিহ্য এক মারাত্মক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন৷

ভারতের সশস্ত্র বাহিনীতে আমি বহুদিন সেবা করেছি, যোগ দিয়েছিলাম স্বাধীনতার পরে পরেই, মাত্র ১৪ বছর বয়সে৷কর্তব্য শেষ করি ৪৫ বছর পর, ভারতের নৌবাহিনীর প্রধান হিসাবে (১৯৯০ থেকে ১৯৯৩)৷ এর মধ্যে ভারতের বহু পর্বান্তর আমি দেখেছি৷১৯৪৭ সালের দেশভাগের ভয়াবহতা থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল সংযোগের ভিন্ন দুনিয়া, সবই প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে৷

আমি এমন একজন হিসাবে এই চিঠি লিখছি, যে হিন্দু বিশ্বাসের মধ্যেই লালিত হয়েছে, বেড়ে উঠেছে৷যে হিন্দুত্বকে আমি জেনেছি তা অপরুষ, আত্মস্থ এবং অসাধারণ বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ৷আমার ধর্ম আমাকে সর্বব্যাপী সব কিছুকে ভালোবাসতে এবং শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছে৷আমার কাছে হিন্দুধর্ম যা, তাতে কোনও রকম হিংসা ও অসহিষ্ণুতার কোনও স্থান নেই৷ কিন্তু এখন ‘হিন্দুত্ব’ বলে যা তুলে ধরা হচ্ছে তাতে দেশজুড়ে বিভেদের আগুন এবং ত্রাস ছড়িয়ে পড়ছে৷

আমি এখন অশীতিপর৷এই বয়সে পৌঁছে চারিদিকে যেভাবে সহ নাগরিক, বিশেষ করে সংখ্যালঘু এবং দলিত নাগরিকদের উপর আক্রমণ ও ঘটনাবলির নজির ক্রমাগত প্রত্যক্ষ করছি তাতে লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে৷যে সশস্ত্র বাহিনী আমাকে ৪৫ বছর ধরে কর্তব্য পালনের সুযোগ দিয়েছে, তা ভারতের সেকুলার নীতিনৈতিকতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ৷ রণতরীতে হোক আর সাবমেরিনেই হোক, যুদ্ধবিমানে হোক কিংবা রণসজ্জাতেই হোক, জাতপাত বা ধর্মের ভিত্তিতে সেখানে কারও প্রতি বৈষম্য করা হয় না৷আমাদের তালিম হয়, আমরা লড়ি, আমরা বাঁচি, আমরা খাই এবং আমরা প্রাণ দিই, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে৷

সুতরাং এখন কেন দেশব্যাপী সংখ্যালঘুদের উপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণের সাক্ষী আমাদের হতে হচ্ছে? বিশেষ করে ২০১৪-র মে মাসে এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর? দেখা যাচ্ছে, কিছু সম্প্রদায়কে একেবারে আলাদা নজরে রেখে দিয়ে বেছে বেছে পৃথক করে ফেলা হচ্ছে, যেমন মুসলমানদের৷এখন এদেশে যে কোনও মুসলিম পুরুষ কিংবা রমণীকে প্রতিপদে তাঁর বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিতে হচ্ছে৷বিশেষ করে, তাঁদের উপাসনাস্থল আক্রান্ত হলে, তাঁদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কিংবা স্বাধীন নাগরিকের অন্য মৌলিক অধিকারগুলি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে৷এর মধ্যে পোড়খাওয়া নেতাদের প্রত্যক্ষ উসকানি ও প্রশ্রয়ে, সম্পূর্ণত অবাঞ্ছিত এবং একতরফা গণহিংসার বলি হয়ে এত প্রাণ ঝরেছে ও তা নিয়ে এত চর্চা হয়েছে যে, আলাদা করে আর সেসবের উল্লেখ করছি না৷

যেভাবে আরএসএস ও তাদের গ্রুপ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ভারতে হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের সংখ্যাগুরুভিত্তিক একমুখি কর্মসূচি পর্যায়ক্রমে এবং ছন্দোবদ্ধভাবে রূপায়িত করার চেষ্টা চলছে, তাকে উদ্বেগজনক ও অস্বস্তিকর বললে কম বলা হয়৷একটা বিপজ্জনক বিন্যাস সেখানে স্পষ্ট৷প্রতিষ্ঠিত আইনের শাসনকে অগ্রাহ্য করা এবং স্রেফ গুজবের ভিত্তিতে জনতাকে তাতিয়ে তোলা৷আর সেই গুজবে খেপে-ওঠা জনতার হাতিয়ার হিসাবে কখনও কাজ করছে হুমকি, কখনও শাসানি এবং একেবারে চূড়ান্ত পরিণাম হিসাবে গণপিটুনিতে হত্যা৷বহু ঘটনাতেই দেখা যাচ্ছে, যাদের উপর আইনরক্ষার ভার তারাও এই ধরনের খেপে-ওঠা জনতার প্রতিই প্রচ্ছন্নভাবে সহমর্মিতা দেখাচ্ছ এবং আচরণগতভাবেও সহায়কের ভূমিকা পালন করছে৷

কিন্তু তার চাইতেও পরিতাপের বিষয় হল, যাঁরা দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা তাঁদের তরফ থেকে দ্ব্যর্থহীনভাবে এসবের নিন্দা করা কিংবা এই ধরনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কোনও নজির আমরা দেখতে পাচ্ছি না৷দুর্ভাগ্যজনকভাবে বার বার দেখা যাচ্ছে, এই সব ঘটনায় সরকার যেন অনেক ভেবেচিন্তে তবেই পা ফেলছে, সরকারের নিরপেক্ষতাও যেন অনেক মাপজোকের ফল৷সরকারে যাঁরা আছেন, তাঁদের সমন্বিত প্রতিক্রিয়া যেন এইসব বিষাক্ত রটনা এবং ঘটনার ওজনটাকেই অনেক কমজোরি করে দিতে চাইছে৷তাঁরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা ‘বিষাদময়’ এবং ‘দুর্ভাগ্যজনক’৷ অথচ এই ধরনের ঘটনার পর দরকার ছিল এমন পালটা মার এবং মনোবলের যা থেকে প্রমাণ হয়ে যেত, ভারতের সমাজ এই ধরনের উন্মত্ত আচরণ কোনও মতেই বরদাস্ত করবে না৷কিন্তু সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে ক্যাবিনেট পর্যায়ের মন্ত্রী এবং নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী, যাঁরা এ ব্যাপারে সামনের সারিতে থেকে মন্তব্য করছেন কিংবা পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তাতে মনে হচ্ছে শাসকদল এবং তার শাখাপ্রশাখা সংগঠনগুলি একটা প্ল্যানমাফিক এগচ্ছে৷

শীর্ষ নেতৃত্বকে এটা আলাদাভাবে বলে দেওয়ার আছে বলে মনে করি না যে, এই ধরনের আচরণ আগুন নিয়ে খেলার শামিল৷বিশেষ করে এমন একটি দেশে, যেখানে মুসলমান এবং খ্রিস্টান তো বটেই, সেইসঙ্গে দলিত এবং আদিবাসীরাও এর মধ্যেই নিজেদের উপেক্ষিত ও অবাঞ্ছিত বলে মনে করতে শুরু করেছেন৷আমাদের অসাধারণ ও বিস্ময়কর বৈচিত্র্যই আমাদের বল৷ অথচ বিশ্বগোষ্ঠীর চোখে আমার ক্রমেই সংকীর্ণ, গোঁড়া, অসহিষ্ণু, বর্ণবিদ্বেষী, এমনকী ফ্যাসিস্ত বলে পরিগণিত হচ্ছি৷ সমাজ নিঃসহায় পংক্তির উপর হিংসার তাণ্ডব ভারতকে বিশ্বের সামনে এক বিকলাঙ্গ গণতন্ত্র হিসাবেই প্রতিপন্ন করছে, যেখানে যাবতীয় প্রতিবাদ-ক্ষোভবিক্ষোভে নিরুৎসাহ দেখানো হচ্ছে এবং মানবাধিকারকে যারা পদদলিত করছে তারা যৎসামান্য শাস্তিটুকুরও ভয় পাচ্ছে না৷

প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রীরা সরকারের দায়িত্ব পেতে ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়েছেন৷ভারতের সংবিধানকে তাঁরা তুলে ধরবেন এ ব্যাপারে তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন৷কিন্তু যেসব ঘটনা দেখছি তাতে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, তাঁরা সে প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ হয়েছেন৷এটা কিন্তু যথেষ্ট চিন্তার ব্যাপার এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় ঐক্যের পক্ষে তা মোটেই শুভ নয়৷কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলিকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, এই ধরনের ঘটনার নিন্দা করতে হবে সর্বাত্মকভাবে৷তাদেরই দেখতে হবে যাতে ন্যায়বিচার হয় এবং অপরাধীরা শাস্তি পায়৷একমাত্র এই ধরনের অভিনন্দনযোগ্য প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপেই এই ধরনের বিভেদকামী শক্তি, তা তারা মূলস্রোতেরই হোক কিংবা পরগাছাই হোক, শিক্ষা পাবে৷আমাদের দেশ ও দেশবাসীর মূল্যবোধের পরম্পরা এবং নানা রংয়ে বোনা সংস্কৃতি নিয়ে ভেংচি কাটার কিংবা তাকে আঘাত করার শিবারব তুলতে আর সাহস পাবে না৷

বিগত পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতে মানুষ এবং সংস্কৃতির এক অসাধারণ মিশেল ঘটেছে৷এখনও ঘটছে৷এ এক অনবরত পরিবর্তিত হতে থাকা চলিষ্ণু প্রক্রিয়া৷ গোটা পৃথিবীর আর কোথাও আমাদের সমাজ ও মানবজীবনের এই বৈচিত্র্য ও অভিনব প্রকৃতির তুলনা মেলে না৷একক ধর্মীয় পরিচয় কিংবা একমুখি সংস্কৃতির ধারণা আমাদের এই প্রাচীন সভ্যতাময় ঐতিহ্যের পক্ষে অবমাননাকর৷

সম্মাননীয় রাষ্ট্রপতি মহাশয় এবং সম্মাননীয় প্রধানমন্ত্রীজি, আপানের উভয়েই ভারতের সংবিধানে অতুলনীয় ভাষায় উৎকীর্ণ প্রত্যেক নাগরিকের বাকস্বাধীনতা, উপাসনা ও মেলামেশার স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষায় ক্ষমতাসীন৷একজন প্রাক্তন ফৌজি এবং আপনাদের মতোই এক বর্ষীয়ান হিসাবে আমিও এই সংবিধানের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ৷এই দেশের একটি নির্বাচিত সরকার সংবিধানের প্রস্তাবনা ও নির্দেশমূলক নীতিতে ঘোষিত প্রত্যেক নাগরিকের অধিকারকে মর্যাদা দিচ্ছে, এটা দেখার দায়িত্ব আমাদের সকলের৷দেশের তিন সেনাবাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার এবং দেশের প্রধান প্রশাসকের কাছ থেকে এটুকুই চাই, আপনাদের হাতে যে দায়িত্বভার ভারতবাসী অর্পণ করেছে, তা আপনারা সযত্নে পালন করবেন এবং প্রয়োগ করবেন৷

এখনই আমরা যদি এই বিষবৃক্ষ সমূলে উৎপাটন না করি, তাহলে হয়তো দেরি হয়ে যাবে৷আমরা ভারতবাসী আপনাদের দিকেই তাকিয়ে আছি৷ গণতন্ত্রের প্রতি যাতে আবার আমাদের বিশ্বাস ফিরে আসে এবং এদেশের প্রত্যেক নাগরিককে মর্যাদা, সৌহার্দ্য এবং সাম্যের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যাতে রক্ষিত হয়, তার জন্য আপনারা প্রয়োজনীয় যাবতীয় ব্যবস্থা নেবেন, এটাই কেবল ভরসা৷

অ্যাডমিরাল এল রামদাস