প্রসেনজিৎ চৌধুরী: কমিউনিস্ট চীন কেমন? এই নিয়ে দুনিয়া জুড়ে ধনতান্ত্রিক দেশগুলির মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে ব্যস্ত ছিল৷ ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট চিনের আত্মপ্রকাশ হয়৷ তার ঠিক পর পরই ১৯৫২ সালে চিন সরকারের আমন্ত্রণে সেদেশে গিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান৷ এমনই পঞ্চাশের দশকে দু বার চিন দেখে এসে দেশটি সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করতে গিয়ে ভ্রমণ কাহিনিতে তিনি লিখেছিলেন- ‘চীন একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে।’

পিতার লেখা এই সফর ডাইরি প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন- বঙ্গবন্ধুর ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়েছে। চিন এখন বিশ্বে একটি বিরাট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি। এই ডাইরি ঘিরেই বিরাট কৌতূহল ঢাকার অমর একুশ বইমেলা৷ কারণ এর লেখক বঙ্গবন্ধু৷ এই বইটির উদ্বোধন হতে চলেছে৷ ডাইরির নামকরণ বঙ্গবন্ধু করেছিলেন- ‘নয়া চীন ভ্রমণ’

তখনও পাকিস্তান অখণ্ড৷ আর দেশটির পূর্ব অংশের নিবাসী বাঙালিরা নিজের ভাষার অধিকার চেয়ে সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছিলেন৷ পূর্ব পাকিস্তানের সেই আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে দ্রুত উঠে এসেছিলেন মুজিবুর রহমান৷

১৯৫২ সালে চিন আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করে৷ এই সম্মেলনে ভারত ও পাকিস্তান ও বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন৷ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান, মানিক মিয়ার মতো ব্যক্তিত্বরা ছিলেন৷ এটি মুজিবুর রহমানের প্রথম চিন সফর। এই সফরে তাঁর সঙ্গে মাও সে তুং এর দেখা হয়েছিল৷ সফরে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে মুজিবুর রহমান চিনের রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন।

১৯৫৭ সালে তিনি দ্বিতীয় বার চিন ভ্রমণ করেন। দু’বার চিন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ডায়েরি লেখেন৷ এই ডাইরিতে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান ও চিনের রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক অবস্থার তুলনা, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের চর্চা বিশ্লেষণ করেছিলেন৷ এই ডায়েরিটি নয়া চীন ভ্রমণ নামে বই আকারে পাবেন পাঠকরা৷

সম্প্রতি চিনা রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং জিয়ানি প্রধানমন্ত্রী সেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন৷ এই সাক্ষাতে মুজিবুর রহমানের চিন ভ্রমণের কিছু ছবির অ্যালবাম বাংলাদেশ সরকারকে দেওয়া হয়৷ মুজিব কন্যা সেই ছবির অ্যালবাম গ্রহণ করেন৷

জানা গিয়েছে, বঙ্গবন্ধু রচিত নয়া চীন ভ্রমণ বইতে এই সব দুর্লভ ছবি স্থান পেয়েছে বলে চর্চা হচ্ছে৷ আর বঙ্গবন্ধুর লেখনীর সঙ্গে আগেই পাঠকরা পরিচিত৷ তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ বের হওয়ার পরই সমাদৃত হয়েছে৷ রাজনৈতিক আলোচনার চর্চাও এই দুটি বই৷ এবার ঢাকার বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশ করা হয়েছে ‘নয়া চীন ভ্রমণ’।

শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান থেকে ছিন্ন হয়ে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ৷ সেই গণআন্দোলন থেকেই মুজিবুর রহমান পরিচিত হন বঙ্গবন্ধু নামে৷ পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের জাতির পিতা৷ অমর একুশে বইমেলার আয়োজক বাংলা একাডেমির তরফে জানানো হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে এবারের বইমেলা এবার উৎসর্গ করা হয়েছে৷ এবারেই প্রকাশ হচ্ছে তাঁর দৃষ্টিকোণ থেকে চিন সম্পর্কিত বইটি৷

তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা- ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চিন সরকার পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল৷ ভারত পাশে দাঁড়িয়েছিল৷ বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার পর কূটনৈতিক কারণেই চিন সম্পর্ক রাখতে মরিয়া হয় ঢাকার সঙ্গে৷ রাষ্ট্রসংঘে বাংলাদেশের প্রবেশের জন্য ভোট দেয় চিন৷ সেই শুরু চিন-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের খতিয়ান৷

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তথা বঙ্গবন্ধু-কে সপরিবারে খুন করা হয়৷ তবে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথেই চিনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে বাংলাদেশ সরকার৷ সম্প্রতি চিনা রাষ্ট্রপ্রধান শি জিনপিং ঢাকা সফর করেন৷ এই সফরে বাংলাদেশকে প্রভূত আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা বলে বেজিং৷