বিশেষ প্রতিবেদন: বালাকোটে ভারতের বায়ুসেনার হামলার পর ধ্বংস হয়ে গিয়েছে পাকিস্তান সেনার মদতপুষ্ট জৈশ-ই-মহম্মদের জঙ্গি ট্রেনিং ক্যাম্প৷ মৌলানা মাসুদ আজহারের বংশ প্রায় নির্বংশ হয়ে গিয়েছে৷ কিন্তু এই ঘটনায় মাসুদের যত না ক্ষতি হয়েছে, তার থেকেও বেশি ক্ষতি হয়েছে পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের৷

নিজের দেশে ‘তালিবান খান’ হিসেবে প্রসিদ্ধ ইমরানকে এই মুহূর্তে জৈইশ-ই-মহম্মদের মত জঙ্গি সংগঠন প্রকাশ্যে দোষারোপ করছে৷ ওই ধর্মীয় উগ্রপন্থী সংগঠনগুলির বক্তব্য, ইমরান জৈইশ জঙ্গিদের বাঁচাতে পারেনি৷ ভারত দেশে ঢুকে মেরে দিয়ে গিয়েছে৷ অথচ, উগ্র ধর্মীয় উগ্রপন্থী সংগঠনগুলিই ‘তালিবান খান’নামক জনৈক ইমরান খানকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বানাতে সাহায্য করেছে৷ শাহবাজ শরিফ বা বিলাওয়াল ভুট্টো, প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে থাকা সবাইকে টোপকে ইমরান কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসতে পারলেন? সেই উত্তর চাইতেও শুরু করেছে জৈশ এবং তার জাত ভাইয়েরা৷

১. বালাকোটের প্রত্যক্ষদর্শীরা ইটালিও সাংবাদিক ফ্রানচেসকো মারিনো ‘ফার্স্টসোর্স’-এ নিজের প্রতিবেদনে লিখেছেন, ভারতের এয়ারস্ট্রাইক বালাকোটে ১২ জন এমন ব্যক্তিকে নিকেশ করেছে যারা পাকিস্তানের ছায়াযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷ জৈশ এর গুরুত্বপূর্ণ মাথারা, প্রাক্তন আইএসআই এজেন্ট, প্রাক্তন পাক সেনারা নিহত হয়েছে৷ প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেছে, এয়ারস্ট্রাইকের এক ঘন্টা পর ৩৪-৩৫টি দেহকে ওই জায়গা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়৷ একটি বড় বস্তায় ১২ জন ঘুমোচ্ছিল৷ তাদের দেহ ওই বস্তাতেই পাওয়া গিয়েছে৷ ওরা প্রত্যেই প্রাক্তন পাক সেনা৷ সাংবাদিক ফ্রানচেসকো মারিনোকে যাঁরা খবর দিয়েছিলেন, তারা প্রত্যেকেই স্থানীয় সরকারি কর্মী৷ তাঁরা কথাবার্তা বলতে ভয় পাচ্ছিলেন৷ কারণ পাক সেনা জানতে পারলে তাদের প্রাণ যাবে৷

২. ভারতের এয়ারস্ট্রাইকের সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় বাসিন্দারা ওই এলাকায় ছুটে যায়৷ কিন্তু পাক সেনার অফিসাররা ততক্ষণে সম্পূর্ণ এলাকা ঘিরে ফেলেছে৷ স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকেও এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয় পাক সেনা৷
৩. আই এস আই অফিসার ‘কর্নেল সেলিম’ভারতের এয়ারস্ট্রাইকের ফলে নিহত হয়েছে৷
৪. আই এস আই অফিসার ‘কর্নেল জারার জাকরি’ গুরুতর আহত হয়েছে৷

৫. পেশোয়ারের জৈশ-ই-মহম্মদের জঙ্গি এবং ট্রেনার মুফতি মোইদের মৃত্যু হয়েছে৷
৬. আইইডি বা বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ উসমান ঘানিরও মৃত্যু হয়েছে৷
৭. একটি বড় বস্তায় ১২ জন ঘুমোচ্ছিল একটি মাটির ঘরে৷ মাথার উপর টিনের চাল৷ এরা জৈইশ-ই-মহম্মদের আত্মঘাতি জঙ্গি৷ এরা প্রত্যেকেই এখন মৃত৷

একটি সর্বভারতীয় সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অত্যাধুনিক ব়্যাডার ব্যবহার করে ধ্বংসের আগে এবং পরের চিত্র তুলে রাখা হয়েছে৷ কেন্দ্রীয় সরকার সূত্রকে খবরের ভিত্তি করে ওই সংবাদপত্র লিখেছে, সার বা সিন্থেটিক অ্যাপারচার ব়্যাডারের চিত্রই ভারতের এয়ারস্ট্রাইকের অন্যতম সেরা প্রমাণ৷ তবে স্যাটেলাইট ইমেজ বা উপগ্রহ চিত্রও ব্যবহার করা যেত৷ কিন্তু এয়ারস্ট্রাইকের পর ওই এলাকায় আকাশে মেঘের ঘনঘটার জন্য পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়নি৷

প্রতীকি ছবি

বালাকোটের জাভা থেকে আরও পূর্বে ছয় একর জমিতে জৈশ-ই-মহম্মদের পরিচালিত ‘তালিম-উল-কোরান’ মাদ্রাসা৷ ওই মাদ্রাসাই সারা পাকিস্তানে জৈশের সব থেকে বড় ট্রেনিং ক্যাম্প৷ বিস্ফোরণের সময় ওই মাদ্রাসায় কতজন ছিল তা বলা কঠিন৷ কারণ আকাশ থেকে ভূমিতে ওই আক্রমণ চালানো হয়৷ ভারতীয় বিদেশ সচিব বিজয় গোখলে সাংবাদিক বৈঠকে বলেছিলেন, আক্রমণে বিরাট পরিমাণ (A Very large number of…) জৈইশ জঙ্গি, ট্রেনার, কমান্ডার এবং আত্মঘাতি হামলার ফিদাইন জঙ্গিদের নিকেশ করা হয়েছে৷ বালাকোটের এই মাদ্রাসা মৌলানা ইউসুফ আজহার ওরফে উস্তাদ ঘউড়ি চালাতো৷ ইউসুফ আজহার হলেন মাসুদ আজহারের শ্যালক৷ এই ‘অসামরিক আগাম আক্রমণে’র লক্ষ ছিল শুধু জৈইশ-ই-মহম্মদ ক্যাম্প ধ্বংস করার৷ সাধারণ মানুষকে লক্ষবস্তু করা হয়নি৷

সাংবাদিক ফ্রানচেসকো মারিনোর দাবি ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা সূত্রে তার কাছে যা খবর এসেছে, কর্নেল সেলিম এবং কর্নেল উসমান ঘানির নাম তারা নিজেদের ‘কমিউনিকেশন ইনটেলিজেন্সের’ মাধ্যমে পেয়েছে৷ ভারতের গুপ্তচর সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইজিং উইং বা ‘র’(R&AW) নাকি পাঁচজন নিহত জঙ্গি এবং আইএসআই এজেন্টের নাম জানতে পেরেছে৷

কিন্তু ওই জায়গায় আরও ২০জনের মৃত্যুর পাকা খবর রয়েছে R&AW এর কাছে৷ কোনও কনোও ভারতীয় মিডিয়ার বক্তব্য ওই জায়গায় ৩০০ জঙ্গি মারা গিয়েছে৷ যদিও তেমন তথ্য এখনও পর্যন্ত উঠে আসেনি৷ R&AW এর খাছে নাকি আরও খবর রয়েছে, জৈশ-ই-মহম্মদের জঙ্গি ট্রেনারদের পুলওয়ামার ঘটনার পরই ওই এলাকা থেকে সরিয়ে দেয় আইএসআই৷ কারণ, তাদের কাছে খবর ছিল, ভারত এয়ারস্ট্রাইক করতে পারে৷

ফ্রানচেসকো মারিনো একজন ইতালিয় সাংবাদিক। তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা কভার করেন। ২০১০ সালে ইতালিয়ায়ন সাংবাদিকতার শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার পেয়েছেন। ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি স্ট্রিঙ্গার এশিয়া নামক একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদিকার দায়িত্ব সামাল দিচ্ছেন।

সারা বিশ্বের এয়ার সার্জিকাল স্ট্রাইকের ইতিহাস বলছে, জঙ্গিরা একটি ডেরায় একজোট হয়ে থাকে না৷ বিভিন্ন গ্রুপে আবদ্ধ হয়ে থাকে৷ ১৯৯৮ সালে আমেরিকা আল কায়দার ঝাওয়ার কিলি ক্যাম্পে ৭৫টি ক্রজ মিসাইল দেগেছিল৷ কারণ কেনিয়া এবং তানজানিয়ার দূতাবাসে আল কায়দা হামলা চালিয়েছিল৷ কিন্তু ৭৫টি ক্রজ মিসাইল মাত্র ১২ জন জঙ্গিকেই খতম করতে পেরেছিল- যুক্তি দিয়েছেন ইটালীয় সাংবাদিক ফ্রানচেসকো মারিনো৷