দিনে দিনে জীবন বড় জটিল হয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকে multi tasking করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছে। ধৈর্যচ্যূতি  ঘটছে অহরহ। সবারই উচ্চাকাঙ্ক্ষা আকাশছোঁয়া। কেউই পিছিয়ে থাকতে রাজি নয়৷একচুলও মাটি ছাড়তে নারাজ প্রত্যেকে। অথচ আমার দিদা, মা’কে দেখেছি তাঁরা  কত অল্পেই সন্তুষ্ট থাকতেন । কোনও নিজস্ব চাহিদা আলাদা করে থাকত না  বললেই চলে। আমার বাবা ভারত সরকারের খুব উচ্চপদস্থ অফিসার ছিলেন। কিন্তু, আমি বরাবর দেখে এসেছি মা খুব সুখে সংসার করেছেন । প্রচুর বন্ধু-বান্ধব নিয়ে  ছুটির দিনে ওঁরা দেদার আনন্দ করতেন।  পার্টি, পিকনিক,  হইচই লেগেই থাকত। বাবা আমার মায়ের  জন্য খুব সুন্দর-সুন্দর শাড়ি  নিয়ে আসতেন৷ নিজেদের  বিবাহবার্ষিকীতে দু’জনে চুটিয়ে  আনন্দ করতেন। কোনদিন কোনও অশান্তি হতে দেখিনি৷ বাবা সব সময় মায়ের  মতামত কে যথেষ্ট  গুরুত্ব  দিতেন। ওঁদের বয়সের ব্যবধান তেমন কিছু বেশি ছিল না৷  কিন্তু, কাউকেই কখনও পরস্পরকে  অগ্রাহ্য বা অসন্মান করতেও দেখিনি। কোনওদিন কোনও ইগোর লড়াইও হতে দেখিনি। কিন্তু, আজকাল দেখি কেউ কারুর তোয়াক্কাই করে না। সাংঘাতিক হীন মন্যতায় ভোগে দু’জনে৷নিজেদের আধিপত্য স্থাপন করার জন্য নানা রকম কারসাজির শরণাপন্ন হয়৷ তার উপর কল-কাঠি নাড়ার লোকের তো অভাব নেই। উপযাচক হয়ে সবাই উপদেশের থলি নিয়ে হাজির হয়ে যায়  শুভাকাঙ্খীর  ছদ্মবেশে।

পদ্মিনী দত্ত শর্মা
লেখিকা: পদ্মিনী দত্ত শর্মা

সব থেকে অবাক হই, যখন দেখি স্বামী-স্ত্রী তাদের অত্যন্ত ব্যক্তিগত সমস্যা নিজেদের মধ্যে আলোচনা না করে এক্কেবারে অপরিচিত লোকজনের সঙ্গে শেয়ার করছে।  নিজেদের মধ্যে বসে শান্তভাবে কথা বললে যেটার সহজেই সমাধান বেরয়৷ সেটা না করে মানুষ ফেসবুকে কমেন্ট চাইছে । এগুলি থেকে এটাই বোঝা যায় যে, সম্পর্কগুলো একেবারেই সার মর্মহীন। এ যেন সবার সামনে নিজের সব থেকে কাছের মানুষকে উলঙ্গ করার প্রচেষ্টা। এতে দুরত্ব আরও বাড়ছে এবং বিশ্বাস বস্তুটি নিলাম হচ্ছে।

ছেলেরা তো বিয়ে করতে রীতিমতো ভয় পাচ্ছে৷ কারণ, কখন তার নামে সম জারি হয় কেউই জানে না। মেয়েটির যদি মনে হয় সে তার বরকে উচিত শিক্ষা দেবে তো, সে একটা ৪৯৮(এ) ধারায়  রিপোর্ট দায়ের করলেই ব্যস হয়ে গেল সব খেলা শেষ৷ পুলিস এসে ছেলেটিকে এবং তার বাবা-মা’কে তুলে নিয়ে চলে যাবে। ক’দিন জেলে থেকে সব সন্মান বিকিয়ে যখন এই সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষরা জামিনে  ছাড়া পেয়ে ছাড়া পাবেন, ততদিনে তাদের সব বাঁচার ইচ্ছে উবে যাবে৷ 498-Problem-Solving
আমাদের পাশের বাড়ির একটি অত্যন্ত মেধাবী এবং সজ্জ্বন ছেলেকে বিয়ের তিনমাসের মধ্যে পুলিশ রাত দেড়টার সময় তুলে নিয়ে চলে গেল৷ সঙ্গে তার  অতি সাধারণ মা-বাবাকেও৷  কারণ, তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী তাদের নামে থানায় নালিশ জানিয়েছি৷ মহিলার অভিযোগ,  ছেলেটি এবং তার মা-বাবা মিলে তাকে নাকি মানসিক অত্যাচার করছে। ছেলেটির বাবা একজন সাধারণ দর্জি৷ প্রচুর স্বার্থত্যাগ করে তারা তাদের এই একমাত্র সন্তানকে পিএইচডি করিয়েছেন। ছেলেটি একটি সরকারি কলেজের অধ্যাপক। আসল কারণটা  জানলে আপনারা সবাই আকাশ থেকে পড়বেন৷ ঠিক যেমন আমি পড়েছিলাম। ছেলেটির বাবা-মায়ের টালির চালের দু’খানি ঘর আছে।  বিয়ের পর ছেলে-বউয়ের  যাতে কোনও অসুবিধে না হয়, তাই তারা সর্বশান্ত হয়ে আর কিছু ব্যাঙ্ক থেকে লোন করে ওই ফ্ল্যাটটি ছেলেকে কিনে দিয়েছিলেন। ফ্ল্যাটটি কেনা হয়েছিল ছেলেটির ও তার মায়ের  নামে। মেয়েটির দাবি ছিল, বাড়িটি মেয়েটির নামে করে দিতে হবে৷  ছেলেটির মা’র সেখানে  কোনও অধিকার থাকবে না। ছেলেটি যেহেতু এই অবাস্তব দাবি মানতে রাজি হয়নি, মেয়েটি তার পরামর্শদাতাদের কথা অনুযায়ী, এই মারাত্মক কান্ডটি ঘটিয়েছিল। ছেলেটিকে যেহেতু সবাই ভাল করে চেনে, তাই ওর চাকরিটা বহাল আছে, আদালতে মামলা চলছে। এটা করে মেয়েটির কি সুবিধে হল আমার বোধগম্যের  বাইরে।

পরবর্তীকালে খোঁজ-খবর  নিয়ে জেনেছি যে মেয়েটি  তার মা এবং মাসির প্ররোচনায় এই ধরনের ভুল পদক্ষেপ নিয়েছিল। মেয়েটি স্বীকার করেছে যে তার মা নাকি তাকে উঠতে বসতে বলত যে, ওটা ওর স্বামীর বাড়ি৷ তাই ওর নামে তাড়াতাড়ি করে নিলেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।  বোকা মেয়ে তো তার নিজের স্বামীর অকারণে এত বড় ক্ষতি করলই, সঙ্গে নিজের সর্বনাশও কিছু কম করল না।
সুচিত্রা সেন অভিনীত ‘সাত পাকে বাঁধা’র পুনরাবৃত্তি ঘটলে কিন্তু একটি মেয়ের পক্ষে খুব একটা শুভপ্রদ হয় না। বিয়ের পর মেয়ের সংসারে মায়েদের নাক না গলানোই ভাল৷ আর সেটা তার নিজের মেয়েরই স্বার্থে। পুরো ভিত্তিহীন সাজানো মামলা ধোঁপে টেকেনি৷ মেয়েটি এখন অথৈ জলের তলায়। তার বাড়িতেও আর বিশেষ স্থান নেই৷ভাইয়ের  বউ উঠতে বসতে জীবন অতিষ্ট  করে দিচ্ছে৷ আর যে মা এই সর্বনাশা খেলায় মেয়েকি নামিয়েছিল, তারও পালানোর পথ নেই।

আর একটি মেয়ে কথা নেই বার্তা নেই চলে গেল ৪৯৮(এ) করতে৷ তার শাশুড়িকে জব্দ করবে বলে।  তার স্বামী কেনও সব কথা তার মাকে জিজ্ঞাসা করে করে, তাতে নাকি মেয়েটি এবং তার  মায়ের ঘোর আপত্তি। মেয়েটির মনে হয়েছে, তার স্বামী তাকে উপেক্ষা করে।  অফিসের  বন্ধুরা ইন্ধন যুগিয়েছিল, যাতে সে তার নিজের অধিকার ভাল করে বুঝে নেয়।  আজকে কিন্তু তার আশপাশে  শুভ-চিন্তকরা কেউ নেই৷পাছে আদালতে গিয়ে সাক্ষী দিতে হয়৷ তাই তারা মেয়েটিকে একটু এড়িয়েই চলে।

তবে এর আর একটা দিকও আছে৷যেটা আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি না। অনেক বাড়িতেই নতুন বউকে মানুষ বলেই মনে করা হয়না৷এক সময় হত না বললেই হয়ত ঠিক বলা হবে।  মেয়েটি যে একটা অন্য পরিবেশ থেকে তার সব আপনজনদের ছেড়ে এসেছে, সেটাকেও ধর্তব্যের  মধ্যেই ধরতো না। Newton-এর সেই famous law “Every action has an equal an opposite reaction” আজ আমরা রন্ধে রন্ধে দেখতে পাচ্ছি। স্ত্রী নির্যাতন যে এক সময় একটা বিরাট আকার ধারণ করেছিল, সে বিষয়ে তো কোনও সংশয় বা দ্বিমত নেই।
498-Problem-Solving-section
আজকে মেয়েরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে নিজেদের সুরক্ষার্থে মরিয়া হয়ে অনেক সময় ভুল করে বসছে।  আমি আর একটা দিকও দেখেছি এবং বিস্মিত হয়েছি যে যারা ভাল তাদের কিন্তু আজও দুর্গতির শেষ নেই। আমার চেনা একটি অতি ভাল মেয়ে আজ চার বছর ধরে আদালতের  দরজায় একটু মুক্তির জন্যে মাথা কুটে মরছে। বিয়ের পরদিন থেকেই সে বুঝতে পারে যে, তার স্বামী অন্য একটি বার গার্লের প্রতি আসক্ত। তাকে সমাজেকেও মেনে নেবে না বলে ছেলেটির বাবা-মা তার বিয়ে এই ভদ্রমেয়েটির সঙ্গে দেন।  তাদের আশা পথভোলা ওই পথিক নিশ্চয় নিজের ভুল বুঝতে পেরে ঠিক পথে  চলা শুরু করবে৷ কিন্তু, তেমন কিছুই যখন হোল না, মেয়েটি অপমান, অসন্মান, অবহেলা সহ্য করতে না পেরে কিছু না নিয়েই বাপের বাড়িতে ফিরে গেল৷  মেয়েটি এবং তার পরিবারের লোকজন আশা করেছিল যে ছেলেটি তার বউকে নিশ্চয় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু সব অপেক্ষার সমাধান করিয়ে এল ডিভোর্সের কাগজ। তারপর থেকে শুরু হয়েছে তার যন্ত্রণা আর আর্থিক ক্ষতি। আমি নিজে আদালতে  গিয়ে দেখলাম উকিলদের খেলা। ওর উকিলরা তার বরের  উকিলের সঙ্গে বোঝাপড়া করে মেয়েটিকে বছরের পর বছর উল্লু বানিয়ে চলেছে। চুল সব পাকা৷ কিন্তু লোভ কমেনি। আজ চার বছর ধরে মেয়েটির কাছ থেকে ডেট ফেলে ফেলে টাকা নিয়ে গিয়েছে৷ এদের না আছে কোনও বিবেক৷ না কোনও নীতিবোধ। হতাশ হয়েছি দেখে এদের মানসিকতা। যে মেয়েটি টাকা কড়ি, গহনাগাটি, খোরপোষ কিছুই দাবি করেনি৷ তার জীবন থেকে কেন পাঁচ-পাঁচটা বছরের সুখ-শান্তি কেড়ে নেওয়া হল? আজকে যদি এই মেয়েটিও ৪৯৮(এ) ধারা করে দিত, হয়ত সবকটাকে এক সঙ্গে জব্দ করতে পারত।

কী বলেন বন্ধুরা৷ কোন পথ ধরা উচিত ভবিষ্যৎ  প্রজন্মের? নাকি বিয়েটাকেই তুলে দিলে সবারই হবে মঙ্গল? নাকি তাতে আরও ভেঙে যাবে বাঁধ ? ঢুকে পড়বে কি আরও নোনাজল? চুরমার করে দেবে কি সব বাধা নিষেধ ?

…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………….

Comments are closed.