সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : কত কিছুই তো কালের নিয়মে হারিয়ে যায়। কিন্তু বাঙালি যাকে বুকে নিয়ে ঘোরাফেরা করে সেই রবি ঠাকুরের স্মৃতিও বেমালুম উধাও হয়েছে এই শহরের বুক থেকে। তার অন্যতম উদাহরণ ৪৯ , পার্ক স্ট্রিট ঠিকানার বাড়ি। এই বাড়িতেই পালিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের প্রথম জন্মদিন। সেই বাড়ি আজ কলকাতার ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ রূপে মুছে গিয়েছে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও এটাই বাস্তব।

কীভাবে কে পালন করেছিলেন রবি ঠাকুরের প্রথম জন্মদিন? সরলা দেবী। তিনি রবীন্দ্রনাথের বোনঝি। দিদি স্বর্ণকুমারীর মেয়ে। ঠাকুর বাড়িতে জন্মদিনের প্রচলন করেছিলেন জ্ঞানদানন্দিনী। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিলেত ফেরত স্ত্রী ঠাকুর বাড়িতে সুরেন্দ্রনাথ এবং ইন্দিরার জন্মদিন করেন এবং মহাধুমধামে। এই জন্মদিন পালন কবি মনকে নিজের জন্মদিন উজ্জাপনের লোভ দেখিয়েছিল বললেও ভুল হয় না। কিন্তু কে করবে তাঁর জন্মদিন পালন। উদ্যোগ নিয়েছিলেন বোনঝি সরলা। নতুন বউঠানের আত্মহত্যার ৩ বছর পর জীবনে প্রথমবার জন্মদিন পালিত হয় শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।

তথ্য বলছে সেই কথাই। ১২৯৪ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ। সেই বছর রবীন্দ্রনাথ ২৭ বছরে পা দিয়েছেন। সস্ত্রীক তিনি ৪৯ নং পার্ক স্ট্রিটে মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ এবং মেজবউঠান জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সঙ্গে থাকতেন। বিপত্নীক জ্যোতিরিন্দ্রনাথও থাকতেন সেই বাড়িতে। এদিকে কবির ন’দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী তখন উল্টোডাঙার কাশিয়াবাগানে থাকেন। ১৮৮৭ সালের মে মাসের সাত তারিখ সেদিনটি ছিল শনিবার স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা সরলা দেবী খুব ভোরে কাশিয়াবাগান থেকে দাদা জ্যোৎস্নানাথকে সঙ্গে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে। সঙ্গে নিয়েছিলেন বাড়ির বকুল ফুলের নিজের হাতে গাঁথা মালা। পথে কিনে নিয়েছিলেন বেল ফুলের মালাসহ অন্যান্য আরও ফুল। এছাড়া একজোড়া ধুতি-চাদর এবং একটি ইংরেজি কবিতার বই, ‘The Poems of Heine’ । এরপর ৪৯ নং পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে নিঃশব্দে ঢুকে সোজা চলে যান রবীন্দ্রনাথের ঘরে।

 

ঘুমন্ত রবীন্দ্রনাথকে জাগিয়ে ফুল মালা ধুতি চাদর – এই নৈবেদ্য তাঁর পায়ের কাছে রেখে প্রণাম করলেন। জ্যোৎস্নানাথ রবিমামাকে প্রণাম করে কবিতার বইটি উপহার দিলেন, যা কিনা রবীন্দ্রনাথের জীবনে জন্মদিনে পাওয়া প্রথম উপহার হিসেবে স্বীকৃত। এরপর আশপাশের ঘর থেকে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও বেরিয়ে এসে রবীন্দ্রনাথকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা আশীর্বাদ প্রণাম জানালেন। সারা বাড়িতে ‘‘রবির জন্মদিন” বলে সাড়া পড়ে যায়। সরলা দেবী রবিমামাকে ‘রইমা’ বলে ডাকতেন। ভাগ্নি সল্লির হাতে ‘রইমা’র প্রথম জন্মদিন এভাবেই পালিত হয়।

 

সে কথা সল্লি নিজে লিখে গিয়েছেন। তাঁর লেখায়, ‘রবিমামার প্রথম জন্মদিন উত্‍সব আমি করাই। অতি ভোরে উল্টাডিঙির কাশিয়াবাগান বাড়ি থেকে পার্ক স্ট্রীটে নিঃশব্দে তাঁর ঘরে তাঁর বিছানার কাছে গিয়ে বাড়ির বকুল ফুলের নিজের হাতে গাঁথা মালা ও বাজার থেকে আনান বেলফুলের মালার সঙ্গে অন্যান্য ফুল ও একজোড়া ধূতি-চাদর তাঁর পায়ের কাছে রেখে প্রণাম করে তাঁকে জাগিয়ে দিলুম। তখন আর সবাই জেগে উঠলেন – পাশেই নতুন মামার ঘর। “রবির জন্মদিন” বলে একটি সাড়া পড়ে গেল। সেই বছর থেকে পরিজনদের মধ্যে তাঁর জন্মদিনের উত্‍সব আরম্ভ হল।’

 

সেই শুরু তারপর থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালিত হয়েছে। শেষ জন্মদিন পালিত হয়েছিল ১৪ এপ্রিল, ১৯৪১ এ শান্তিনিকেতনে। কিন্তু কখন যে শহরের বুক থেকে হারিয়ে গিয়েছে রবির প্রথম জন্মদিন পালনের স্মৃতিধন্য বাড়ি তা জানা যায়নি। প্রসঙ্গত শুধু তাঁর জন্মদিন পালনের জন্য নয় পার্কস্ট্রীটের ওই বাড়িতে বসেই কবি গীতবিতান ও মায়ার খেলায় সুর আরোপ করেছিলেন। বাকি ইতিহাস কেন , তার ফসিলটুকুও পড়ে নেই।

প্রশ্ন অনেক: দ্বিতীয় পর্ব