বিশ্বজিৎ ঘোষ

কলকাতায় মিডিয়ার এক অফিসের গাড়ি চেপে সেখানকারই বেশ কয়েকজন সাংবাদিক উপভোগ করতে গিয়েছেন তিন নম্বর রবিনসন স্ট্রিটে৷ খবর সংগ্রহের জন্য নয়৷ শুধুমাত্র উপভোগের জন্য বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন দফায় ওই অফিসের কৌতূহলী ওই সাংবাদিকরা পৃথক পৃথক দলে গিয়েছেন সেখানে৷

গড়পড়তা পাবলিকের বিভিন্ন অংশও উপভোগ করতে গিয়েছে শেক্সপিয়র সরণির ওই তিন নম্বর  রবিনসন স্ট্রিটে৷ শুধুমাত্র দিনের বেলা নয়৷ উপভোগের জন্য সেখানে রাতেও হানা দিয়েছে গড়পড়তা পাবলিকের কোনও কোনও অংশ৷ তেমনই, কলকাতা পাভলভ হাসপাতালেও হানা দিয়েছে গড়পড়তা পাবলিকের কোনও কোনও অংশ৷ সেলিব্রিটিরা সাধারণত গড়পড়তা পাবলিক হিসেবে গণ্য হন না৷ তেমনই এক সেলিব্রিটি অর্থাৎ, ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও গাড়ি চেপে ওই তিন নম্বর রবিনসন স্ট্রিটে পরিদর্শনে গিয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ৷

পাবলিক যে কম গোলমেলে নয়, সেই বিষয়টি শুধুমাত্র সিনেমাকে কেন্দ্র করেই ১৯৬৬-তে ‘নায়ক’ অরিন্দম মুখার্জিকে দিয়ে বলিয়ে দিয়েছেন মহান চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়৷ কিন্তু, শেষ পর্যন্ত সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো একজন সেলিব্রিটিও গড়পড়তা পাবলিক হয়ে গেলেন!  অসম্ভব নয়৷ কেননা, কোনও সেলিব্রিটি মানেই যে তিনি গড়পড়তা পাবলিকের মতো আচরণ করবেন না, তার কোনও মানে নেই৷ সেলিব্রিটি মানেই যে গড়পড়তা পাবলিকের মতো কোনও কুসংস্কার অথবা ভ্রান্ত ধারণায় আবদ্ধ থাকবেন না, তাও নয়৷

তেমনই সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন অংশ৷ তেমনই পুলিশের বিভিন্ন অংশও৷ তেমনই আবার সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি এবং অংশও৷ বড় গোলমেলে বিষয়৷ আর, তার সঙ্গে কোনও কোনও ক্ষেত্রে আবার রয়েছে গোলকধাঁধাও৷ সেই গোলকধাঁধা এমনই যে, ডিম আগে, না মুরগি আগে! তেমনই, মিডিয়া যা খাওয়ায় পাবলিক কি সেটাই খায়! না, পাবলিক যেটা খায় মিডিয়া সেটা খাওয়ায়! এবং, গোলকধাঁধায় এখন আবার কলকাতার শেক্সপিয়র সরণির তিন নম্বর ওই রবিনসন স্ট্রিটও৷

মিডিয়া অর্থাৎ, সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন অংশ যে তিন নম্বর রবিনসন স্ট্রিটকে কেন্দ্র করে এ ভাবে গোলকধাঁধায় হাবুডুবু খাওয়াতে পারে পাবলিকের বড় অংশকে,  সেই বিষয়ে কোনও কোনও মহল কম বিস্মিত নয়৷ মিডিয়ার ওই ভূমিকায় আবার যথেষ্ট ব্যথিত এবং ক্ষুব্ধ কোনও কোনও মহলও৷ যদিও, মিডিয়ার ওই গোলকধাঁধা গড়পড়তা পাবলিক তো বটেই, সমাজের যে সব মহলকে সাধারণত গড়পড়তা পাবলিকের আওতায় আনা হয় না, সেই সব মহলেরও কোনও কোনও অংশ বেশ উপভোগ করেছে৷ তিন নম্বর রবিনসন স্ট্রিট যেন এক উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু৷ কাজেই, এমন উৎসবে মেতে না উঠলে চলে!

অথচ, এমন উৎসবের প্রভাব সমাজের বিভিন্ন অংশে বিরূপ প্রতিক্রিয়াও তৈরি করে৷ সেক্ষেত্রে, ওই বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার জন্য দায় কি এড়াতে পারে মিডিয়া? আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল৷ তবে, বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ওই আশঙ্কা সত্যি হতেও শুরু করেছে৷ সংবাদমাধ্যমে তিন নম্বর রবিনসন স্ট্রিটের কাহিনির লাগাতার সাক্ষী হওয়ার জেরে, গত বুধবার বিধানসভায় অসুস্থ হয়ে পড়েন এক বিধায়ক৷ এই ঘটনা একটি উদাহরণ মাত্র৷ তবে, প্রকাশ্যে না আসায় উদাহরণ হয়ে উঠতে পারেনি, বিরূপ প্রতিক্রিয়ার তেমন ঘটনারও কম সম্মুখীন হতে হচ্ছে না৷ তার উপর, ‘পার্থ’-র নামে কাউকে টিটকিরি করার ঘটনাও দেখা দিতে শুরু করেছে৷

আরও একটি উদাহরণ দক্ষিণ কলকাতার গল্ফগ্রিন৷ পার্থ দে-র পর গল্ফগ্রিনে আরও এক ‘সাইকি’-র খোঁজ বিভিন্ন রকম-ধরনে দিয়েছে মিডিয়ার বিভিন্ন অংশ৷ খবরে প্রকাশ, ২০০৮ থেকে গল্ফগ্রিনের এক যুবক জঞ্জাল সংগ্রহ করে জমা করেন তাঁদের ঘরে৷ কিন্তু, প্রতিবেশীরা ওই যুবকের ঘরের দুর্গন্ধ আর সহ্য করতে পারছিলেন না৷ তাই তাঁরা স্থানীয় কাউন্সিলরকে জানিয়ে পুলিশের সহায়তা নেন৷ তবে, আইন অনুযায়ী ওই যুবকের বিরুদ্ধে কোনও ভূমিকা পালন করতে পারেনি পুলিশ৷ এ দিকে, ওই যুবক জীবজন্তুর মৃতদেহ জমা করেন বলেও প্রতিবেশীদের অভিযোগ প্রকাশ পেয়েছে মিডিয়ায়৷ অথচ, এত বছর ধরে এত দুর্গন্ধ সহ্য করেও, শেষ পর্যন্ত কি না তাঁদের বোধোদয় হল তিন নম্বর রবিনসন স্ট্রিটের কাহিনি প্রকাশ্যে আসার পর!

মিডিয়ায় প্রকাশ, ২০০৫-এ গল্ফগ্রিনের ওই যুবক প্রহৃত হয়েছিলেন৷ তার পর থেকে তিনি জঞ্জাল সংগ্রহ করে ঘরে জমানো শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা৷ তবে, এমনও দেখা গিয়েছে, ঘর এবং কখনও কখনও বাইরে থেকে সংগৃহীত জঞ্জালের সহায়তায়, একের পর এক অসাধারণ শিল্পকর্ম উপহার দিয়েছেন কলকাতায় কেন্দ্রীয় সরকারের এক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের এক মহিলা অধ্যাপক-গবেষক৷ বর্তমানে প্রাক্তন ওই অধ্যাপক-গবেষকের ওই সব শিল্পকর্মে মূলত স্থান পেয়েছিল পেঁচার বিভিন্ন ভঙ্গি৷ এবং, ওই শিল্পকর্মের কাহিনি ছাপার অক্ষরে প্রকাশও হয়েছিল মিডিয়ার একটি অংশে৷ কী বলা হবে, প্রাক্তন ওই মহিলা অধ্যাপক-গবেষকের ওই কর্মকাণ্ড কি অস্বাভাবিক আচরণের জের? কারও কোনও সমস্যা তৈরি না করে কেউ যদি নিজের মতো থাকতে চান, তা কি অন্যায়?

এমন নানা বিষয়ে যুক্তি-তর্ক-আলোচনা-সমালোচনার অভাব হবে না৷ গল্ফগ্রিনের ওই যুবক যে সংস্থায় চাকরি করেন, সেই সংস্থার এক আধিকারিকের মত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে৷ ওই মত অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে ওই যুবকের অস্বাভাবিক কোনও আচরণ প্রকাশ পায়নি৷ অথচ, মিডিয়ার একটি অংশে ছাপার অক্ষরে এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মত প্রকাশ পেয়েছে, পার্থ দে-র মতো গল্ফগ্রিনের ওই যুবকও সাইকোসিসে আক্রান্ত৷ এই মত অবশ্য ওই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মনে হওয়া থেকে প্রকাশ পেয়েছে৷ কী আশ্চর্য!  পার্থ দে-র বিষয়ে মিডিয়ার বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন মনোবিদ অথবা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের বিভিন্ন মনে হওয়া কিংবা ধারণা প্রকাশ পেয়েছে৷ অথচ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমন প্রকাশ পায়নি যে, পার্থ দে-র কেস হিস্ট্রি না জেনে-বুঝে মত ব্যক্ত করবেন না সংশ্লিষ্ট মনোবিদ অথবা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ৷ দু’-একটি ক্ষেত্রে অবশ্য পার্থ দে-র কেস হিস্ট্রি না জেনে-বুঝে সংশ্লিষ্ট মনোবিদ অথবা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মত ব্যক্ত করতে না চাওয়াটাও কি তা হলে অস্বাভাবিক আচরণ?

অস্বাভাবিক আচরণের বিষয়টি নিয়ে অবশ্য কম জটিলতা নেই৷ যেমন, সমকাম৷ এই বিষয়টি অস্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গণ্য হয়৷ যার জেরে, সমকামীদেরও প্রশ্ন, কোনও একটি বিষয়কে কীভাবে অস্বাভাবিক আচরণ হিসেবে স্থির করে দেওয়া সম্ভব? কেননা, কোনও একটি বিষয় অধিকাংশের কাছে অস্বাভাবিক মনে হলেও, অন্য অনেকের কাছে তা স্বাভাবিক মনে হতেই পারে৷ কাজেই, দু’জন সমলিঙ্গের মধ্যে যৌন সম্পর্ক গড়ে উঠলে, সেটা একান্তই তাঁদের বিষয়৷ কে, কাকে ভালোবাসবেন, তা কি সমাজ স্থির করে দেবে?

তবে, তেমন হয় না৷ যে কারণে, বিভিন্ন রকম এবং ধরনের সমস্যা দেখা দেয় সমাজ নির্ধারিত বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে৷ অথচ, সমাজের স্থির করে দেওয়া অথবা নির্ধারিত প্রতিটি বিষয়-ই যে ধ্রুবসত্য, তাও নয়৷ বিভিন্ন সময়ে কখনও কারণ, কখনও আবার অকারণে সমাজ স্থির করে দিয়েছে নানা রকম-ধরনের প্রথা-রীতি৷ সমাজ নির্ধারিত ওই সব প্রথা-রীতি মানেই যে নানা রকম-ধরনের কুসংস্কার এবং ভ্রান্ত ধারণা মুক্ত, তাও নয়৷ তবে, বিভিন্ন সমাজ এবং সেই সমাজের বিভিন্ন অংশে চালু রয়েছে নানা রকম-ধরনের প্রথা-রীতি৷ কোনও কোনও ক্ষেত্রে যুক্তি দেওয়া হয়, সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার জন্যই চালু রয়েছে ওই সব প্রথা-রীতি৷ কারণ, সমাজের সদস্যদের বড় একটি অংশ, যাকে গড়পড়তা পাবলিকও বলা যেতে পারে, সেই অংশের মধ্যে তেমন বোধোদয় সম্ভব হয় না৷ যে কারণেই, নানা রকম-ধরনের প্রথা-রীতির প্রয়োজন দেখা দেয়৷ ওই সব প্রথা-রীতির সহায়তায় ওই অংশকে সমাজে আবদ্ধ রাখার প্রচেষ্টা জারি থাকে৷ যাতে, সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়৷

কাজেই, নামকরা কোনও বিজ্ঞানী অথবা চিকিৎসক যদি তাঁর বিশ্বাস অনুযায়ী ‘গ্রহ দোষ’ দূর করতে পাথর ধারণ করেন, সমস্যা দেখা দেয় সেই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেও৷ পাথর ধারণ এবং নামকরা কোনও বিজ্ঞানী অথবা চিকিৎসকের উল্লেখ উদাহরণ মাত্র৷ তাঁদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাঁরা পাথর ধারণ করতেই পারেন৷ কিন্তু, নামকরা কোনও বিজ্ঞানী অথবা চিকিৎসকের পাথর ধারণের বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় গড়পড়তা পাবলিকের মধ্যে৷ কেননা, গড়পড়তা পাবলিক এমন যুক্তি খুঁজে পায় যে, এত নামকরা কোনও বিজ্ঞানী অথবা চিকিৎসক পাথর ধারণ করেছেন, তার মানে ‘গ্রহ দোষ’ দূর করতে পাথরের ক্ষমতা রয়েছে৷ কাজেই, কোনও একটি পরিবারের অধিকাংশ সদস্য যদি ওই গড়পড়তা পাবলিকের মতো হন এবং সেই পরিবারেই যদি কোনও সদস্য গড়পড়তা পাবলিকের মতো না হন, তা হলেও সমস্যা দেখা দেয়৷

কারণ, পাথর হোক অথবা অন্য কোনও বিষয়, সেই বিষয়ের পক্ষে যেমন গড়পড়তা পাবলিকের যুক্তি থাকে, তেমনই ওই একই বিষয়ের পক্ষে আবার গড়পড়তা পাবলিক নয়, সেই অংশেরও যুক্তি থাকে৷ এবং, একই বিষয়ে ওই দু’ পক্ষের নিজ নিজ যুক্তির জেরে দেখা দেয় দ্বন্দ্ব৷ অন্যদিকে, নাম করা কোনও বিজ্ঞানী অথবা চিকিৎসককে সাধারণত গড়পড়তা পাবলিক হিসেবে গণ্য করা হয় না৷ কিন্তু, তাঁরা যদি ‘গ্রহ দোষ’ দূর করতে পাথর ধারণ করেন, তা হলে তাঁরা কিন্তু গড়পড়তা পাবলিকের মধ্যেই রয়ে গেলেন৷ তেমনই, কোনও সেলিব্রিটি অথবা সমাজের তথাকথিত বিভিন্ন উচ্চ অংশের কোনও সদস্য মানেই যে তিনি গড়পড়তা পাবলিকের মতো নন, তাও নয়৷ গড়পড়তা পাবলিকের গণ্ডির বাইরে বের হতে না পারার বিষয়টি অবশ্য অন্যায়ও নয়৷

এ দিকে, সমাজ নির্ধারিত নানা রকম-ধরনের প্রথা-রীতির সঙ্গে নানা রকম-ধরনের কুসংস্কার অথবা ভ্রান্ত ধারণা যুক্ত রয়েছে৷ সে সব কুসংস্কার অথবা ভ্রান্ত ধারণা থেকে সমাজকে মুক্ত করাও প্রয়োজন৷ তার জন্য কোনও কোনও মহলের তরফে প্রচেষ্টাও জারি রয়েছে৷ তার পরেও সমাজের কোনও সদস্য যদি গড়পড়তা পাবলিকের গণ্ডিতেই আবদ্ধ থেকে যান, তা হলে তিনি সেই গণ্ডিতেই আবদ্ধ থেকে যেতে পারেন৷ অথচ, সমস্যাও দেখা দেয়৷ কারণ, কোনও একটি বিষয়ে কোনও এক বা একাধিকের মতের সঙ্গে অধিকাংশের মত নাও মিলতে পারে৷ কিন্তু, ওই এক বা একাধিকের মতকে যেমন অধিকাংশের তরফে সম্মান জানানো উচিত৷ তেমনই,  অধিকাংশের মতকেও সম্মান জানানো উচিত ওই এক বা একাধিকের তরফে৷ অথচ, বহু ক্ষেত্রে এমনটা হয় না৷ যে কারণে, অন্য কারও সমস্যা তৈরি না করে কেউ যদি নিজের মতো থাকতে চান, তেমন বহু ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দেয়৷ কিন্তু, ওই সব ক্ষেত্রে অন্যদের সমস্যা কোথায়?

সমস্যা তো রয়েইছে৷ কারণ, ওই গড়পড়তা পাবলিক৷ কেননা, গড়পড়তা পাবলিকের মনে হয়, সমাজ নির্ধারিত প্রথা-রীতি না মানায় অনাচার হচ্ছে৷ এবং, তার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়টিকে অস্বাভাবিক আচরণ হিসেবেও তকমা সেঁটে দেয় গড়পড়তা পাবলিক৷

মিডিয়ায় বিভিন্ন রকম-ধরনের কর্মী রয়েছেন৷ যার মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিকরাও৷ তাঁরাও সমাজের অংশ৷ এবং, ওই একই কারণ, সাংবাদিক মানেই যে তিনি গড়পড়তা পাবলিকের গণ্ডিতে আবদ্ধ নন, তাও নয়৷ তেমনটা সম্ভবও নয়৷ কাজেই, কলকাতার ওই সব সাংবাদিকও উপভোগ করতে যেতেই পারেন তিন নম্বর রবিনসন স্ট্রিটে৷ তেমনই আবার, ওই একই কারণের প্রভাব থেকে যাতে পারে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও৷ তেমনটা প্রকাশও পেয়েছে মিডিয়ার বিভিন্ন অংশে তিন নম্বর রবিনসন স্ট্রিটকে কেন্দ্র করে৷ ওই খবর এমনভাবে পরিবেশিত হয়ে চলল এবং তার জেরে শুধুমাত্র গড়পড়তা পাবলিকের মধ্যেই কতটা বিরূপ প্রভাব পড়ল, তাও প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে গেল হয়তো ওই কারণেই৷ যে কারণেই হয়তো মিডিয়ারই কোনও কোনও অংশে প্রশ্ন তোলা হল, পার্থ দে আদৌ অসুস্থ?

মিডিয়ার একটি অংশে সম্প্রচারিত হল, পার্থ দে-র ৯০ শতাংশ সিজোফ্রেনিয়া রয়েছে৷ ওই কথা বললেন এক বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক এবং সেখানকার সংশ্লিষ্ট সংবাদপাঠিকাও৷ অসুস্থ পার্থ দে-র ওই তথ্য লিখিত আকারেও প্রকাশ পেল (সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের স্ক্রিনে)৷ কিন্তু, কারও জ্বর হলে কি বলা হয়, তাঁর ৯০ শতাংশ জ্বর হয়েছে?  বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের এক আলোচনা অনুষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সঞ্চালিকা এমনও ইঙ্গিত দিলেন যে, দেবযানী দে-র কঙ্কালের সঙ্গে পার্থ দে-র যৌন সম্পর্ক রয়েছে৷ সিজোফ্রেনিয়া (যদিও, পার্থ দে কোন ধরনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত, শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তা স্পষ্ট নয়)-র বিষয়ে ছাপার অক্ষরে সংবাদমাধ্যমের একটি অংশে প্রকাশ পেল, ওই ধরনের কোনও আক্রান্তের প্রধান সমস্যা হল, তিনি অতিরিক্ত যৌন কামনা-বাসনায় ভোগেন৷ পরিবারের সব সদস্য ওই ধরনের আক্রান্তের মতো ভাবতে শুরু করেন৷ অথচ, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিজোফ্রেনিয়ায় সব ক্ষেত্রেই যে অতিরিক্ত যৌন কামনা-বাসনায় ভুগবেন আক্রান্ত, তা নয়৷ পরিবারের সব সদস্যই যে আক্রান্তের মতো ভাবতে শুরু করবেন, তাও নয়৷ এমন হল, কোনও পরিবারের একজন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন৷ এবং, তা প্রকাশ্যে চলে এল৷ সেক্ষেত্রে, ওই খবরের জেরে যদি গড়পড়তা পাবলিকের মনে হয় যে, ওই পরিবারের সকলেই সিজোফ্রেনিক, তখন তার দায় কে নেবেন?

প্রশ্ন উঠছে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও৷ পুলিশের কাজ পুলিশ করবে৷ কিন্তু, পুলিশ যদি ডাক্তার হয়ে যায়, তা হলে? অথছ, তেমনই প্রকাশ পাচ্ছে সংবাদমাধ্যমে৷ খবরে প্রকাশ, পার্থ দে-র বিষয়ে পুলিশের মনে হয়েছে, মানসিক অসুস্থ কোনও মানুষ প্রয়োজনীয় কোনও নম্বর তাঁর ফোনে রাখতে পারেন কি না৷ লোভনীয় কোনও খাবার ফোন করিয়ে তিনি আনাতে পারেন কি না৷ মানসিক হাসপাতালে কেন নিয়ে যাওয়া হল, সেই প্রশ্ন তিনি করতে পারেন কি না৷ মানসিক হাসপাতালে না রাখার কথা তিনি বলতে পারেন কি না৷ ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা তিনি জোর দিয়ে বলতে পারেন কি না৷ আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন কি না৷ এমন নানা বিষয়ের পাশাপাশি পার্থ দে-র ডায়েরি এবং বিভিন্ন চিরকুটের লেখা দেখেও পুলিশের ধারণা হয়েছে যে,  সে সব কোনও মানসিক অসুস্থের হতে পারে না৷ এমনকী, তথ্য-প্রযুক্তির প্রাক্তন কর্মী পার্থ দে মানসিক ভারসাম্যহীন হতে পারেন না বলেও জোরের সঙ্গে দাবি করেছে পুলিশ৷ আর, তার জন্য যুক্তি হিসেবে পুলিশের তরফে বলা হয়েছে, ইন্টারনেটে নিয়মিত পছন্দের বিষয় সার্চ করতেন তিনি৷

পুলিশ যদি ডাক্তার হয়ে ওঠে, তা হলে চিকিৎসক কী করবেন! অন্যদিকে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পার্থ দে-কে খবরের কাগজ দেওয়া হয়েছে পড়ার জন্য৷ সেই খবরের কাগজে রয়েছে পার্থ দে-র ছবি সহ তিন নম্বর রবিনসন স্ট্রিটের রিপোর্ট৷ ওই খবরের কাগজ দেখে যে কম যন্ত্রণা অনুভব করেননি পার্থ দে, তা তাঁর প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে৷ এ ভাবে খোদ হাসপাতালেই মানসিক সমস্যায় কোনও আক্রান্তকে যন্ত্রণায় বিদ্ধ করা উচিত? এ দিকে আবার, পুলিশের পাশাপাশি তিন নম্বর রবিনসন স্ট্রিটের ঘটনায় নিজ নিজ তদন্ত করছে মিডিয়া এবং পাবলিকও৷ ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিডিয়ার বিভিন্ন অংশে এমন বিভিন্ন রকম-ধরনের খবর প্রকাশিত এবং সম্প্রচারিত হয়ে চলেছে, তার মধ্যে কল্পনাও কম স্থান দখল করে নেয়নি৷ তার উপর প্রকাশ পেয়েছে ব্যক্তিগত নানা তথ্যও৷ সৌভাগ্য যে, পার্থ দে-র তরফে এই মুহূর্তে কল্পনা মিশ্রিত কোনও খবরের বিরুদ্ধে মানহানি মামলার কোনও সুযোগ নেই৷ তেমনই, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ্যে আনার বিরুদ্ধে কোনও সওয়ালে তিনি অংশ নিতেন কি না, এই মুহূর্তে তাঁর তরফে সেই সুযোগও নেই৷ এ সব নানা কারণেও কি মিডিয়ার তরফে এমন তদন্ত?

এবং, পাবলিক? আহা, এমন তদন্ত থেকে কি আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন গড়পড়তা কোনও পাবলিক!  কাজেই, স্থান-কাল ভেদে কতই-না বিচার-বিশ্লেষণ চলছে গড়পড়তা পাবলিকের বিভিন্ন অংশে! কোনও কোনও ক্ষেত্রে তো আবার রহস্য কার্যত উদঘাটনও করে ফেলা হচ্ছে! বিশেষজ্ঞরা কিন্তু বলছেন, মানসিকভাবে অসুস্থ কারও সব কথাই যে অসংলগ্ন অথবা অসঙ্গতিতে ভরা থাকে, তা নয়৷ বাস্তব এবং অবাস্তব, দুই জগতেরই কথা বলেন তিনি৷ তিন নম্বর রবিনসন স্ট্রিটে যে নরকঙ্কাল উদ্ধার হয়েছে, তা আদৌ দেবযানী দে-র কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়৷ যদি ওই কঙ্কাল দেবযানী দে-রই হয়, তা হলে মৃতদেহের অন্তিম সংস্কার না করার বিষয়টিও যথাযথ নয়৷ তাই বলে, এ ভাবে ডাক্তার হয়ে উঠবে পুলিশ এবং মিডিয়ার বিভিন্ন অংশ?

=============================================