শুভদীপ রায় চৌধুরী: বঙ্গে দুর্গাপুজোর প্রচলন বহুদিনের। এখানে দেবী কোথাও মহিষাসুরদলনী আবার কোথাও সিংহবাহিনী। কোথাও তিনি অতসীপুষ্পবর্ণা আবার কোথাও শিউলি ফুলের বোঁটার মতন রঙ তাঁর। বিভিন্ন বৈচিত্র্যের মধ্যে বহু বছর ধরে পুজো চলে আসছে বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে। শাক্ত-শৈব ও বৈষ্ণবধারার পীঠস্থান শান্তিপুরেও রয়েছে এমন অনেক প্রাচীন বনেদিবাড়ি, যেখানে বহুবছর ধরে পুজো হয়ে আসছে নিষ্ঠার সাথে, তেমনই ২৬২ বছর ধরে পুজো হয়ে আসছে এই অঞ্চলের বাইগাছিপাড়ার সেনবাড়িতে।

সেনবাড়ির পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ছিল শান্তিপুর অঞ্চলের কাছেই ‘হরিপুর ব্রহ্মশাসন’ নামক এক অঞ্চলে, সেখানেই দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল ১৭৫৮ সালে, শুরু করেছিলেন কৃষ্ণকুমার সেন মহাশয়।

পলাশীর যুদ্ধের পরের বছরই সেন বাটীতে দুর্গার আরাধনা শুরু হল, সেই কারণ হিসাবে সেনবাড়ির বর্তমান সদস্য শ্রী জয়নারায়ণ সেন মহাশয় জানালেন, পলাশীর যুদ্ধের সময় বাংলার নবাবকে নবদ্বীপাধিপতি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তিনি নানা ভাবে সহায়তা করেছিলেন। এরপরই দুর্গাপুজোর সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে গৃহবন্দী করেছিল। কিন্তু তাঁরই প্রজারা তাঁর প্রতি সন্তুষ্টি ছিল সেই দুঃখে সেনবাড়ির সপ্তমপুরুষ পুজো শুরু করলেন সেনবাটীতে।

 

হরিপুরে থাকাকালীন ম্যালেরিয়া রোগের প্রকোপের কারণে সেনবাড়ির পূর্বপুরুষেরা চলে আসেন শান্তিপুরের মতিগঞ্জ নামক অঞ্চলে সেখানেও পুজো চলে ধারাবাহিকভাবে আনুমানিক ১৮৮০ সালে। কিন্তু পরপর পাঁচবছর বন্যার কারণে পুজো বন্ধ হয় এবং সেই অঞ্চল থেকে সেনবাড়ির সদস্য শ্রী মাধবচন্দ্র সেনের পুত্র শ্রী রামগোপাল সেন এই বাইগাছিপাড়ায়। এই রামগোপাল সেন শান্তিপুরের অদ্বৈতবংশের কোন একজন পুরুষের থেকে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধারায় দীক্ষিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত পাঁচবছর বন্যার কারণে দুর্গাপুজো বন্ধ থাকায় বাইগাছিতে এসে রামগোপাল সেনের স্ত্রী মতিসুন্দরী দেবী পুজোর আগে এক মৃন্ময়ী দুর্গাবিগ্রহ নিয়ে আসেন, সেই থেকে আবার পুজো শুরু হয়ে যায় সেনবাড়িতে। এই বাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনা হয় রথযাত্রার দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে, তারপর মৃন্ময়ী প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়।এই বাড়ির দুর্গার রঙ স্বর্ণবর্ণা এবং একচালচিত্রের প্রতিমায় ডাকের সাজ দেখা যায়।

 

সেনবাড়ির দুর্গাপুজো হয় “দেবপুরাণ” মতে এবং ষষ্ঠ্যাদিকল্পারম্ভে পুজোর শুরু। এই বাড়ির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল ষষ্ঠীর দিন বিকালেই নবপত্রিকার স্নানপর্ব হয় এবং সপ্তমীর দিন ঘটপ্রতিষ্ঠা ও মূল বিগ্রহে পূজা শুরু হয়। বাড়িতে সম্পূর্ণ নিরামিষ অন্নভোগের প্রচলন রয়েছে, খিচুড়িভোগ, পোলাও, লুচি, পাঁচ রকমের ভাজা, নানান রকমের তরকারি, মিষ্টান্ন, পায়েস, নারকেলনাড়ু ইত্যাদি নিবেদন করা হয় এবং দশমীর দিন ফলমিষ্টিভোগ ও দধিকর্মা নিবেদন করা হয় দেবীকে। দুর্গাপুজোর মহানবমীতে এই পরিবারে চালকুমড়ো এবং আঁখ বলিদানের প্রথা রয়েছে। এছাড়া মহানবমীতিথিতে ধুনোপোড়ানোর রীতিও রয়েছে সেন বাড়িতে। দুর্গাপুজোর মহাষ্টমীর দিন হয় কুমারিপুজো হয় এবং সন্ধিপূজাতে ১০৮দ্বীপদান হয়। দশমীর দিন দেবীবরণের পর কনকাঞ্জলিপ্রথাও রয়েছে সেনবাড়িতে। উমা আবার শ্বশুরঘরে যাচ্ছেন তাই কনকাঞ্জলি দিয়ে বাড়ির মেয়েকে বিদায় জানানো হয় এবছরের মতন।

অতীতে কাঁধে করে দেবীর বিসর্জন হলেও বর্তমানে সেই প্রথা বন্ধ। এইভাবেই বহু বছরের এই পুজো আজও নিষ্ঠার সাথে মহাসমারহে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে এবছর করোনা ভাইরাসের কারণে সাধারণ দর্শকের জন্য ঠাকুরদালানে দেবীদর্শন হয়তো বন্ধ থাকতে পারে বলেই জানালেন পরিবারের বয়ঃজ্যেষ্ঠ সদস্য শ্রী জয়নারায়ণ সেন মহাশয়।

তথ্য লিপিবদ্ধেঃ শুভদীপ রায় চৌধুরী

প্রশ্ন অনেক: দশম পর্ব

রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবিই শুধু নন, ছিলেন সমাজ সংস্কারকও