পূজা মণ্ডল, কলকাতা: এসএসসির চাকুরী প্রার্থীদের অনশন আজ ২৬ দিনে গড়াল। তবু এখনও পর্যন্ত মুখ তুলে চান নি মুখ্যমন্ত্রী। শিক্ষামন্ত্রীর তরফে ২ বার সামনাসামনি বৈঠক হয়েছে। ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত করে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। পার্থ বাবু জানিয়েছেন, যারা যোগ্য তাঁদের ভয় পাবার কোন কারণ নেই। কিন্তু মেলে নি কোন লিখিত আশ্বাস। যার কারণেই ২৬ দিন হয়ে গেলেও ভুখা পেটে বসে আছেন তারা।

অনশন স্থলে যারা গিয়েছেন, তাঁদের নিশ্চয় চোখে পড়েছে, ২৬ দিনে বিভিন্ন সমস্যার কথা লিখে তুলে ধরা প্লাকাট বদলেছে বিভিন্ন দিন বিভিন্ন সময়, কিন্তু বহু প্লাকাটের মাঝে উঁকি মারছে একটি পুরনো প্লাকাট। চারকোনা প্লাকাটির গায়ে লেখা রয়েছে ” মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাই। ” সংগ্রামের পথে আন্দোলনকারীদের আশা যার ছোঁয়ায় সিঙ্গুর – নন্দীগ্রাম – পাহাড় – জঙ্গলমহল অধিকার ফিরে পায়, তাঁর দৃষ্টিতেই ফিরতে পারে তাঁদের ভবিষ্যৎ।

কিন্তু কেন নীরবতা বজায় রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী ? সোমবার রাত গড়ালেই এসএসসির অনশন ছাপিয়ে যাবে সিঙ্গুর রেকর্ড। এখনও কেন দৃষ্টি ফেরাচ্ছেন না তিনি? বহুফসলি জমিতে একলাখি গাড়ি কারখানা হবে। সঙ্গে ব্রিটিশ আমলের কৃষক-বিরোধী জমি অধিগ্রহণ আইন আর বিধানসভা ভোটে বিপুল জয়ের আত্মবিশ্বাস।

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ভরসায় ২০০৬ সালের মে মাসে সিঙ্গুরে ন্যানো কারখানা তৈরির কথা ঘোষণা করে টাটা। সিঙ্গুরের অনিচ্ছুক কৃষকরা জানিয়ে দেন, গায়ের জোরে বহুফসলি জমি অধিগ্রহণ তাঁরা মানবেন না। শুরু হল আন্দোলন। যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে কত প্রতিবাদই তো হারিয়ে যায় সময়ের গভীর অতলে। কিন্তু সিঙ্গুরের প্রতিবাদের মন বুঝতে দেরি করেননি তিনি। অসহায় অনিচ্ছুক কৃষকদের পাশে দাঁড়ালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সিঙ্গুরের বিডিও অফিস থেকে তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে দিয়েছিল প্রশাসন। ফিরে এসে মেয়ো রোডে অবস্থানে বসেন তিনি। জোর করে জমি নেওয়ার প্রতিবাদে ধর্মতলার মেয়ো রোডে তাঁর ২৬ দিনের অনশন সিঙ্গুরের আন্দোলনকে এক ল্যান্ডমার্কে পরিণত করেছিল। সিঙ্গুর আন্দোলনের শঙ্খ ধ্বনি বাংলার বুকে নিশ্চিত করেছিল অগ্নিকন্যার আগমন।

২০০৭-এর গোড়ায় কারখানা তৈরির কাজ শুরু করল টাটা। কলকাতা হাইকোর্ট রায় দিল, সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণে ভুল করেনি বাম সরকার। সোনার ফসল ফলানো মাটি আগলে রাখতে কঠিন লড়াই। সে দিন অকুতোভয় আটপৌরে গ্রামবাসীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের সাহস হারাতে দেননি মমতা। সিঙ্গুরের সানাপাড়ায় ধর্নায় বসলেন মমতা। ১৫ দিনের ধর্নায় অবরুদ্ধ দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে। কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হল টাটারা। রাজভবনে তত্‍কালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর মধ্যস্থতায় বুদ্ধদেব -মমতা মুখোমুখি হলেও ভেস্তে গেল আলোচনা। এরপর আরও আড়াই বছর ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট সরকার। কিন্তু তারপরই ২০১১ সালের নির্বাচন জানিয়ে দিয়েছিল বাংলার মানুষের নেত্রী হিসেবে মমতাকেই প্রয়োজন। সিঙ্গুর সরণি বেয়ে মহাকরণে পৌছে যান মমতা। প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েই জানিয়ে দেন জমি ফেরাবেই তাঁর সরকার।

জমি ফেরাতে ২০১১ এর জুনে বিধানসভায় পাশ হল সিঙ্গুর জমি পুনর্বাসন ও উন্নয়ন বিল। টাটারা কলকাতা হাইকোর্টে গেলে সেপ্টেম্বরে সিঙ্গল বেঞ্চ রায় দেয় সিঙ্গুর আইন বৈধ। সিঙ্গল বেঞ্চের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে যায় টাটা মোটর্স। ২০১২ এর জুনে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সিঙ্গুর আইন অবৈধ বলে রায় দেয়। জমি ফেরাতে সুপ্রিম কোর্টে যায় রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে সিঙ্গুরের অনিচ্ছুক কৃষকদের জন্য দুটাকা কিলো দরে চালের ব্যবস্থা হয়।

অবশেষে স্বাধীনতার মাসের শেষ দিনে এল আনন্দের বার্তা। সুখের সাগরে ভাসল সিঙ্গুর। সুপ্রিম কোর্ট রায় দিল, সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ অবৈধ। অধিগৃহীত সব জমিই কৃষকদের ফিরিয়ে দিতে হবে। দুর্গতিনাশিনীর পুজোর আগেই যেন দুর্গতিনাশ হল সিঙ্গুরে। সিঙ্গুরের লড়াইয়ের বার্তা কলকাতা-সহ গোটা দেশ, বিশ্বের কাছে পৌছে গিয়েছিল।

যে মেয়ো রোডে ধর্নায় বসে বাংলার ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন মমতা, সেই মেয়ো রোডেই ধর্নায় বসেছেন ভবিষ্যতের শিক্ষকরা। দিন সংখ্যাটাও গড়িয়েছে ২৬ শে। দেখা যাক, সিঙ্গুর রেকর্ডকে পিছনে ছেড়ে কোন ইতিহাস লেখে এই জায়গা!