নিখিলেশ রায়চৌধুরী: সম্প্রতি কলকাতায় বেশ কয়েকজন কট্টরপন্থী মুসলিম জঙ্গি ধরা পড়েছে৷ জেরায় তারা জানিয়েছে, আরও কিছু জঙ্গি পশ্চিমবঙ্গে ঢুকেছে এবং কলকাতা শহর ও তার আশপাশের জেলায় ঘাপটি মেরে রয়েছে৷ যারা ঢুকেছে তারা বাংলাদেশে উদারপন্থী চিন্তাধারার মানুষের হত্যাকাণ্ডে জড়িত৷ সেই সূত্রে একাধিক অনাবাসী বাংলাদেশি জানিয়েছেন, কলকাতায় যে কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের এমন ঘাঁটি রয়েছে সে কথা তাঁদের জানা ছিল না৷

তাঁরা ইউরোপ-আমেরিকায় থাকেন৷ কলকাতায় যে এই ধরনের জঙ্গিদের ঘাঁটি থাকতে পারে, সে কথা তাঁরা না-ও জানতে পারেন৷ কিন্তু কলকাতা পুলিশ বহুকাল ধরেই জানে যে, এই শহর এবং হাওড়া ও পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলগুলি দশকের পর দশক এই ধরনের সন্ত্রাসবাদীদেরই আশ্রয়স্থল ছিল এবং এখনও তা-ই আছে৷

আরও পড়ুন: গোলাপে বরণ মুম্বই হামলার চক্রী হাফিজ সইদকে

কলকাতায় এই ধরনের সন্ত্রাসবাদীরা আস্তানা খুঁজে পায় একটাই কারণে৷ অন্ধকারের জগৎ এবং রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে মধুচন্দ্রিমার পর্বটি এই মহানগরীতে বহু দিন ধরে চলছে৷ ফলে, অন্ধকারের জগৎ যখন এই ধরনের চালানি সন্ত্রাসবাদীদের আশ্রয় দেয় তখন রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা সেটা দেখেও দেখেন না৷ স্বাভাবিকভাবে পুলিশকেও সে ব্যাপারে চোখ বুজে থাকতে হয়৷
এই অবস্থাটার সৃষ্টি হয়েছে মূলত মুম্বইতে দাউদ ইব্রাহিমের জমানার অবসান ঘটার পর৷ তার পর থেকেই তারা বুঝেছে, কলকাতা তথা পশ্চিমবাংলা এমন একটা জায়গা যেখানে অনায়াসে জলে নুন-চিনি গুলে যাওয়ার মতো যে কেউ মিশে যেতে পারে৷ টাকা ছড়াতে পারলেই হল৷

আরও পড়ুন: মুম্বই হামলার মাস্টারমাইন্ড লাকভির ভাইপোকে খতম করল সেনা

সিপিএম-পরিচালিত বিগত বামফ্রন্ট জমানাতেই এই অবস্থাটার সূচনা ঘটেছিল৷ জ্যোতিবাবুর আমলেই৷ তার পর দিন যত গড়িয়েছে ততই এদেশের বিভিন্ন দিক এবং বাংলাদেশ থেকে আগত সন্ত্রাসবাদীরা পশ্চিমবঙ্গকে নিরাপদ মুক্তাঞ্চলের মতো ব্যবহার করার ভরসা পেয়েছে৷

অনেকেরই বোধহয় মনে নেই, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের, এই কলকাতার বুকেই প্রথম পাঞ্জাব পুলিশ এসে খলিস্তানিদের একটি মডিউলকে ধ্বংস করেছিল৷ সেই অপারেশনের আগে তারা কলকাতা পুলিশকে ঘুণাক্ষরেও কিছু জানায়নি৷ কিংবা জানালেও পুলিশ কর্তারা তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের তা জানতে দেননি৷ জানালে হয়তো পাখি ফুড়ুৎ করে পালিয়ে যেত৷

আরও পড়ুন: মুম্বই হামলায় জড়িত নয় হাফিজ সইদ: পাকিস্তান

পরবর্তীকালে এই পশ্চিমবঙ্গকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশ থেকে আগত কট্টরপন্থী মুসলিম জঙ্গিরা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেইসব জায়গায় নাশকতামূলক কার্যকলাপে অংশ নেয়৷ এটা ঘটতে শুরু করেছিল মূলত বাংলাদেশে বেগম খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পর৷ কারণ, বেগম খালেদা জিয়ার আমলেই পাকিস্তানের সামরিক গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) ঢাকায় তাদের অপারেশনাল হেডকোয়ার্টার্স সরিয়ে আনে এবং সেখান থেকে আল-কায়েদার অনুগামী সন্ত্রাসবাদীদের ভারতে ঢোকানোর প্রক্রিয়াটা আরম্ভ করে৷

কারগিল যুদ্ধের পর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মুশারফ বুঝেছিলেন, অধিকৃত কাশ্মীর সীমান্ত কিংবা ভারতের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে জঙ্গি চালানের কাজকর্ম কঠিন হয়ে পড়েছে৷ অতএব যা করার তা করতে হবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং অসম-ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়ে৷ আর, লিঙ্কম্যানের কাজ করার জন্য দাউদ ইব্রাহিমের নেপাল বেস তো রয়েইছে৷

আরও পড়ুন: ফের ভারতে পরমাণু হামলার হুঁশিয়ারি মুম্বই হামলার মাস্টার মাইন্ডের

ভারতের নিরাপত্তা তথা গোয়েন্দা বাহিনী যখন এই ট্রানজিট রুটের খবর পেয়ে তৈরি হচ্ছিল এবং পূর্ব সীমান্তে আরও সতর্কতা বাড়াচ্ছিল ঠিক সেই সময়েই ঘটল ২৬ নভেম্বরের মুম্বই হামলার ঘটনা৷ ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের সতর্ক হওয়া উচিত ছিল৷ তার কারণ, ২৬ নভেম্বরের মুম্বই হামলার আগেও ওই মহানগরে একের পর এক জঙ্গি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল৷ এমনকী, গেটওয়ে অব ইন্ডিয়ার কাছেই দিনেদুপুরে বিস্ফোরণ ঘটে এবং বহু মানুষ তাতে মারা যায়৷ তার পরেও রাজনীতিকদের হুঁশ ফেরেনি এই জন্যই যে, তাঁরা কখনই ভাবেননি আক্রমণটা সরাসরি আরব সাগরের দিক থেকে আসবে৷ তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন, ওদিকে নিরাপত্তা অটুট রয়েছে৷

আরও পড়ুন: প্রকাশ্যে এল মুম্বই হামলায় জড়িত পাক সেনা অফিসারের নাম

এই নিশ্চিন্ত থাকার ভাবটাই কিন্তু প্রবল ধাক্কা খাওয়ার প্রধান কারণ৷ কোনও কিছু ঘটে যাওয়ার পর তো আর সতর্ক হওয়ার কোনও মানে হয় না৷ ভাবতে হয় আগে থেকে৷ ঠিক যেমন আগাম ভাবতে হয়, একটা সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনও দাগী অপরাধীকে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত কি না৷ প্রচুর দাগী অপরাধী টিকিট পেয়ে ভোটে জিতে এমএলএ কিংবা এমপি হয়ে গেল৷ তার পর একদিন সকালে উঠে মনে হল যে, এরা আর ভোটে দাঁড়াতে পারবে না, এমন তো হতে পারে না! একবার যদি আমি পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে নানা রঙয়ের সরীসৃপের বসবাসের জন্য গর্ত খুঁড়ে দিই, তাহলে পরে টন টন কার্বলিক অ্যাসিড ঢেলেও কোনও কূলকিনারা পাব না৷ কারণ, ওইসব সাঙ্ঘাতিক গর্ত দিয়েই সন্ত্রাসবাদীদের আগমন ঘটে এবং তারা এদেশের জাতিধর্মনির্বিশেষে শত শত নিরীহ মানুষের প্রাণ অবলীলায় হরণ করে৷

আরও পড়ুন: খতিয়ে দেখা হবে মুম্বই হামলায় ব্যবহৃত বোট

আজমল কাসবের ফাঁসি হয়েছে বটে, কিন্তু কীভাবে তারা এদেশে ঢুকেছিল এবং এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে বহু সাধারণ মানুষকে নিহত করার পাশাপাশি কেন তারা স্নাইপার শটে মুম্বই পুলিশের একাধিক বাঘা এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট অফিসারকে হত্যা করেছিল, সে ব্যাপারে কোনও তদন্ত রিপোর্ট আজ পর্যন্ত ভারতের সাধারণ নাগরিকদের সামনে প্রকাশ করা হয়নি৷ কোনও সাংবাদিক যদি সে ব্যাপারে বেশিদূর এগতে যান, তাহলে তাঁদের অবস্থাও হয়তো সাংবাদিক জ্যোতির্ময় দে-র মতোই হবে৷

সুতরাং, এদেশে সন্ত্রাসবাদীরা যাদের কাছ থেকে তোল্লাই পায় তাদের ডানাগুলি যদি ছাঁটা না যায়, তাহলে কোনও সতর্কতাতেই কোনও লাভ হবে না৷ আজ কয়েকজন এখানে ধরা পড়ল তো অমনি অন্য কোথাও আগামীকাল পলিটিক্যাল ব্যাকডোর দিয়ে আরও কিছু ফিদায়েঁ অ্যামনেস্টি পেয়ে গেল, এই ধরনের চোর-পুলিশ খেলায় তো এদেশের মানুষের কোনও লাভ হবে না৷ যে রাজনীতিকরা ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গেই ভুলে যান যে, তাঁদের মাইনে দেন করদাতা নাগরিকরা, দেশদ্রোহিতার অপরাধে তাঁদের জেলে ঢোকানো না গেলে সন্ত্রাস-দমনমূলক যে কোনও বন্দোবস্তই বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো হয়ে যাবে৷

আরও পড়ুন: মুম্বই হামলায় ভারতের কাছে আরও তথ্যপ্রমাণ চাইল পাকিস্তান