২১ জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের এবার ২২ বছর হচ্ছে ৷ একেবারে সাজ সাজ রব রাজ্যজুড়ে শহিদ দিবসের প্রস্তুতিতে৷ শোনা যাচ্ছে এবারে নাকি জনসমাগম অন্যবারকে ছাপিয়ে যাবে- চমক থাকবে দল ভাঙানোর৷ কিন্তু আজও অস্পষ্ট সেদিনের গুলি চালনায় প্রকৃত দোষী কারা৷ রাজ্যে পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের৷ ক্ষমতায় আসার পর তিনি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ২১ জুলাইয়ের ঘটনার তদন্তে বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠন করেছিলেন ৷ বছর তিনেক ধরে তদন্ত চালিয়ে ৫৯ জনের সাক্ষ্য নিয়ে সেদিনের হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা পড়লেও উত্তর মেলেনি কার নির্দেশে গুলি চলেছিল৷ ফলে প্রকৃত দোষীদের সাজা দেওয়ার তেমন কোনও প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত মেলেনি৷ অবশ্য সেটা হবেই বা কী করে এখন তো দিদিমনিকে সবার সঙ্গে রং মেলাতে হয়, তাই সিপিএমের হার্মাদরা সবুজ জামা গায়ে দিলে তারাও ‘ওয়েলকাম’ ৷
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানে নেমেছিলেন যুব কংগ্রেস কর্মীরা৷ আর তখন তাদের উপরে গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। সেই ঘটনায় মোট ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে অভিযোগ। তারপর থেকে প্রতিবছর সেই হত্যাকাণ্ডের দিনটি শহিদ দিবস হিসেবে পালন করে থাকেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর কয়েক বছর পর মমতা কংগ্রেস ছেড়ে নতুন দল তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলে তাঁর দলই এই শহিদ দিবস মূলত পালন করে থাকে৷ অনেক সময় রাজ্য কংগ্রেসের নেতারা ২১ জুলাইকে তাদেরও শহিদ দিবস বলে দাবি করে তা পালন করার কথা বললেও তাতে তেমন সাড়া মেলে না৷ তাই যে যাই বলুক ২১ জুলাই পালনের একচ্ছত্র অধিকার যে মমতার তা নিয়ে কোনও সন্দেহ থাকার কারণ নেই যেহেতু সেদিনের মহাকরণ অভিযানের নেতৃত্ব তিনিই দিয়েছিলেন৷ কিন্তু তাঁর উদ্যোগে গড়া তদন্ত কমিশন রিপোর্টে কী বলতে চাইল তা তো বুঝতেই পারল না মানুষ ৷ কমিশনের রিপোর্টে গুলিচালনাকে ‘অবৈধ, অনৈতিক, অসাংবিধানিক’ বলা হয়েছে । তবে কে ওই ‘অবৈধ, অনৈতিক, অসাংবিধানিক’ কাজের জন্য দায়ী, তা নিয়ে নির্দিষ্ট করে কোনও কিছুই বলা হয়নি। তবে কমিশনের মতে, তৎকালীন মহাকরণ ও লালবাজারের কর্তারা ঘটনার দায় অস্বীকার করতে পারেন না। ফলে সেই সময়ের স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্তের ভূমিকা নিয়ে আলাদা করে প্রশ্ন উঠেই যাচ্ছে ৷ কারণ এই আমলাটি বাম জমানায় জ্যোতি বসু- বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের স্নেহধন্য হওয়ায় পরে রাজ্যের মুখ্যসচিবও হয়েছিলেন৷ তবে এই মণীশবাবুই আবার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর স্নেহধন্য হয়েছেন৷ ফলে তিনিই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিদ্যুতমন্ত্রীর পদে বহাল রয়েছেন৷ স্বাভাবিক ভাবেই তদন্ত রিপোর্টে বর্তমান সরকারের অস্বস্তি বেড়েছে ৷ আর বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে – তবে কি মন্ত্রিসভার এই সদস্যকে আড়াল করতেই শেষ মেশ অজানা রয়ে গেল সেদিনের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত দোষী? স্বাভাবিক ভাবেই হতাশ হয়ে কোনও কোনও মহলের কটাক্ষ – আগেকার সরকার মানুষ খুন করেছিল আর এই সরকার সেই খুনীদের পুরস্কৃত করছে ৷ 21-july
তবে মণীশ গুপ্ত বলে তো নয় লাল্লু আলমের মতো লোকেদেরও ঠাই দিয়েছেন মমতা৷ কলকাতার রাস্তায় বিরোধীদের উপর সিপিএম তথা বাম আক্রমণের কথা উঠলেই ২১ জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের মতোই আলোচিত আর একটি ঘটনা হল হাজরা মোড়ে লাল্লু আলমকে দিয়ে মমতার উপর প্রাণঘাতী আক্রমণের ঘটনা৷ আজ থেকে সিকি শতাব্দী আগে বাসের ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে ১৯৯০ সালের ১৬ অগস্ট বনধ ডাকে কংগ্রেস৷ সেদিন হাজরা মোড়ে তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছিল সেই সময়কার দাপুটে সিপিএম নেতা বাদশা আলমের ভাই তথা লালপার্টির মারকুটে ক্যাডার লাল্লু আলম৷ সেদিন তার লাঠির আঘাত সরাসরি পড়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথায়৷ সেদিনকার যুব কংগ্রেস নেত্রীর মাথায় একুশটির মতো সেলাই পড়েছিল৷ রাজ্যে পালাবদলের পর সেই লাল্লু আলম শিবির বদল করে এখন মমতা অনুগামী৷ শুধু আমলা ক্যাডার কেন বুদ্ধিজীবীরাও এখন শিবির বদল করছেন৷ আগে যারা বুদ্ধ অনুগামী বলে পরিচিত ছিলেন, নন্দীগ্রামের ঘটনার পরে যারা তৎকালীন রাজ্যসরকারের হয়ে সওয়াল করতেন তাঁদের কেউ কেউ তো এখন দিদির চেয়ারে জল পড়লে তা মুছে পরিষ্কার করতেও সিদ্ধহস্ত ৷
রাজনীতির আঙিনায় ভেসে থাকার জন্য কিংবা বা স্রেফ বেঁচে থাকার জন্য তৃণমূলের দরজায় অনেকেই কড়া নাড়তে গিয়ে দেখছে দরজা তো হাট করে খোলাই রয়েছে৷ রাজনীতিতে কেউ অচ্ছুত নয় তাই সকলকেই জায়গা দিতে হবে৷তৃণমূল কংগ্রেস পার্টি বাড়বে বড় থেকে আরও বড় হবে৷ বিরোধী বলে কিছুই থাকবে না ৷ সকলেই দলে ঠাই পাবে, সকলেই তৃণমূল হয়ে যাবে ৷ তবু এমন জয় করেও ভয় কাটবে না৷ নব্য বনাম পুরানো তৃণমূলের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আরও বেশি করে মাথা চাড়া দেবে৷ ইতিমধ্যেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের তো ইঙ্গিত মিলেছে ৷ তবুও কি সচেতন হওয়া যাবে না? তা না হলে ২১ জুলাই পালনে সার্থকতা কোথায়?

প্রতিবেদক: সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়