সুভাষ বৈদ্য, কলকাতা: মন খারাপের ২১শে জুলাই৷ প্রতি বছর এই দিন আসলেই মন খারাপ হয়ে যায় সিরাজুলের৷ ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই৷ তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী তথা আজকের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গুলি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল সিরাজুল। হাতে তুলে নিয়েছিলেন বন্দুকও৷ তারই খেসারত দিতে হয় ১৯৯৬ সালে। ২৩ বছর আগে চাকরি খুইয়ে এখন অভাবের সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন সেদিনের যুবক সিরাজুল৷ রাজ্যপাটে পালা বদলের পর মিলেছিল সাহায্যের প্রতিশ্রুতি৷ সে সব আজ অতীত৷ ২১শের মঞ্চেও ব্রাত্য সে৷

হারানো চাকরি ফিরে পেতে মমতার বাড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন দফতরে ঘুরে ঘুরে আজ সে ক্লান্ত। গত বছর মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি গিয়েছিলেন। তবে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়নি৷ তখন মমতার বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম৷ তিনিই আশ্বাস দিয়েছিলেন সিরাজুলকে৷ শুধু তাই নয়, তাঁর দফতরে কাগজপত্র নিয়ে সিরাজুলকে দেখা করতে বলেছিলেন। তারপর রাইটার্সে গিয়ে মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে দেখা করেন সিরাজুল। জমা দিয়েছিলেন সমস্ত নথিপত্র। কিন্তু আজ পর্যন্ত সিরাজুল তার হারানো চাকরি ফিরে পাননি।

উত্তর ২৪ পরগনা জেলার গোবরডাঙা ইছাপুর ভদ্রডাঙ্গা গ্রামের সরল সাধাসিধে এই মানুষটি অতি কষ্টে রয়েছেন নিজের পরিবার নিয়ে৷ পরিবার বলতে মা, বাবা, ভাই ও বোন। চাকরি হারিয়ে নিজের আর সংসার করা হয়নি। ৮৪ বছরের বৃদ্ধ বাবা ইসরাইল মণ্ডল আর ৭০ বছরের মা রূপভান মণ্ডল। বঞ্চিত তারাও। দুঃখের সঙ্গে সিরাজুল জানান, ‘‘নিজের চাকরি নেই। তার উপর বার্ধক্য ভাতাটুকুও আমার বাবা, মাকে দেওয়া হচ্ছে না। পরিবারকে নিয়ে প্রায় পথে বসতে চলেছি। আয় বলতে যখন যে কাজ পাই, সেই কাজ করে বেঁচে আছি।২২

আজ থেকে ২৬ বছর আগে ২১ জুলাই ১৯৯৩ সালের ঘটনা। সেদিন পুলিশ কর্মী সিরাজুলের ডিউটি ছিল রাইটার্স বিল্ডিং-এ। তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহাকরণ অভিযানের ডাক দেন। ব্রের্বোন রোড দিয়ে যাওয়ার সময় পথ আটকায় পুলিশ৷ শুরু হয় বচসা৷ পুলিশ লাঠিচার্জ করে৷ মাথা ফাটে মমতার। বিনা প্ররোচনায় লাঠিচার্জের প্রতিবাদ করেন স্পেশাল ব্রাঞ্চের এসআই নির্মল বিশ্বাস, সার্জেন্ট প্রদীপ সরকার এবং কনস্টেবল সিরাজুল। মমতাকে বাঁচাতে সেদিন সিরাজুল ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের দিকে বন্দুক তাক করেছিলেন। সেটাই তার অপরাধ।

গ্রামের ছেলে সিরাজুল ১৯৮৮ সালের ১৯শে জানুয়ারী পুলিশে চাকরি পান। মমতাকে বাঁচানো এবং বন্দুক তাক করার অপরাধে ১৯৯৬ সালে সিরাজুলকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় ৷ তবে ১৮ বছর আইনি লড়াই করার পর চাকরি ফিরে পান নির্মল বিশ্বাস। সার্জেন্ট প্রদীপ সরকার প্রমোশন ছাড়াই অবসর নিতে বাধ্য হন ৷ আর সিরাজুল ইসলাম হাইকোর্টে মামলা করেও টাকার অভাবে বেশিদিন লড়তে পারেননি। তাই একুশে জুলাই আসলেই তার মন খারাপ হয়ে যায়।

প্রশ্ন অনেক-এর বিশেষ পর্ব 'দশভূজা'য় মুখোমুখি ঝুলন গোস্বামী।