মানব গুহ, কলকাতা: ইতিহাস বইয়ে লেখা ব্রিটিশদের হাত থেকে ভারত স্বাধীন হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট৷ কিন্তু, ইংরেজ চলে গেলেও তাদের নিয়ম কানুনে এখনও ভুগছে ভারতবাসী৷ ঠিক যেমন, কলকাতা হাইকোর্ট৷ এখনও ১৭ শেষ হতে বাকি বেশ কিছু দিন৷ তার আগেই প্রকাশিত, ২০১৮ র হাইকোর্টের ক্যালেন্ডার হাসি ফুটিয়েছে কোর্টের কর্মী থেকে শুরু করে আইনজীবী ও বিচারকদের মুখে৷ গোটা ক্যালেন্ডার লাল-ই-লাল অর্থাৎ ছুটিই ছুটি৷ আরও লক্ষ লক্ষ মামলার পাহাড় জমবে আদালতে৷ চিন্তার পাহাড় বিচারপ্রার্থীদের চোখে মুখে৷

কথায় আছে, Justice Delayed Justice Denied৷ যদিও, আমাদের দেশে এই প্রবাদ ক্লিশে হয়ে গেছে৷ কারণ এখানে বিচারে দেরিটাই স্বাভাবিক৷ কলকাতা হাইকোর্টের কথাই ধরা যাক৷ হাইকোর্ট বছর শুরু করছে ১২৪ টি ছুটি দিয়ে৷ বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে অফিসিয়াল কাজ বন্ধ থাকবে ১২৪ দিন৷ বছরের এক তৃতীয়াংশ দিন অফিসিয়ালি আদালত বন্ধ৷

হাইকোর্টের ছুটির তালিকা থেকে সব রবিবার এবং দ্বিতীয় ও চতুর্থ শনিবার বাদ দিলে ছুটির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৮ টি৷ মাসে গড়ে ৪ টি করে৷ ক্যালেন্ডার বলছে, মে মাসে ছুটির সংখ্যা ১৬ টি, অক্টোবরে পুজোর মাসে ছুটির সংখ্যা ২২ টি, নভেম্বরে ১৭ টি ও ডিসেম্বরে ছুটির সংখ্যা ১৪ টি৷ অর্থাৎ মে মাস ও বছরের শেষ তিনটে মাসে কলকাতা হাইকোর্টে কোন কাজ হবে না বললেই চলে৷ ঠিক যেমন চলত স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ আমলে৷

একনজরে দেখে নেওয়া যাক, কলকাতা হাইকোর্টে ২০১৮ সালে কোন কোন মাসে কদিন করে ছুটি৷ জানুয়ারী ১০ দিন, ফেব্রুয়ারী ৬ দিন, মার্চ ৯ দিন, এপ্রিল ৭ দিন, মে ১৬ দিন, জুন ৮ দিন, জুলাই ৭ দিন, আগষ্ট ৭ দিন, সেপ্টেম্বর ৮ দিন, অক্টোবর ২২ দিন, নভেম্বর ১৭ দিন ও ডিসেম্বরে ১৪ দিন ছুটি৷ মে মাসে গরমের ছুটি, অক্টোবর-নভেম্বরে পুজোর ছুটি, ডিসেম্বরে ক্রিস্টমাসের ছুটিতে আদালত প্রায় বন্ধ বললেই চলে৷ এত ছুটি, বিচারপ্রার্থীরা বিচার কি করে পাবেন? বহূবছরের প্রশ্নের আজও কোন জবাব নেই৷ ছুটির নিয়ম এখনও পড়ে আছে সেই ব্রিটিশ আমলেই৷

ছুটির সংখ্যা অনেক বেশি৷ তাই জমে আছে, জমছে লক্ষ লক্ষ মামলা৷ কিন্তু আসল বিপদটা লুকিয়ে আছে ‘ফুল কোর্টে’৷ ‘ফুল কোর্ট’, সেটা কি ? হাইকোর্টে কোন কর্মী, আইনজীবী বা বিচারকদের কেউ মারা গেলে সেদিন ছুটি হয়ে যায় পুরো আদালতের৷ কোন কাজ হয় না সেদিন৷ গোটা রাজ্য থেকে যারা বিচারের জন্য আসেন হাইকোর্টে তাদের এসে আবার ফিরে যেতে হয়৷ ফুল কোর্ট ছুটির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই মুখ খুলেছেন বিচারপতিরা৷ ফুল কোর্ট ছুটির বিরোধীতা করেছেন আইনজীবীরাও৷

আইনজীবী গোপাল মন্ডল জানিয়েছেন, ছুটির চেয়েও এই ফুল কোর্ট ছুটির জন্য সারাবছর সমস্যায় পড়েন বিচারপ্রার্থীরা৷ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে সাধারণ মানুষকে আদালতে এসে আবার ফিরে যেতে হয়’৷ ফুল কোর্ট ছুটি বন্ধের জন্য তাঁদের তরফ থেকেও অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোন কাজ হয় নি’৷

এরপর আছে বিভিন্ন দাবী দাওয়াতে ছুটি, প্রতিবাদ আন্দোলন, বিচারপতি, আইনজীবী, ও কোর্ট ক্লার্কদের শরীর খারাপ ইত্যাদি ইত্যাদি৷ যথারীতি এই দিনগুলোতেও আদালতে কোন কাজ হয় না৷ এরপরেও কখনও আইনজীবীদের গড়িমসিতে দেরী হয় বিচার পেতে৷

দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু কিছু কিছু নিয়ম এখনও পড়ে আছে সেই ব্রিটিশ আমলেই৷ কোথায় যাবেন সাধারণ মানুষ? আইনের পীঠস্থান কলকাতা হাইকোর্টেই যদি চোখের সামনে এই হাল হয়, তাহলে বিচারপ্রার্থীদের আশা, ভরসা ও বিশ্বাস কোথায় থাকবে? আর সেই কারণেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করাটাই ছেড়ে দিচ্ছে ভারতবাসী৷ কারণ সবাই পরিস্কার জেনে গেছে, কিছুই করার নেই, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে৷

- Advertisement -