সুভীক কুন্ডু: বিশ্বজুড়ে নাশকতা ও জঙ্গি হামলার ঘটনা৷ যার সাম্প্রতিকতম বর্বোরচিত উদাহরণ কাশ্মীর উপত্যাকার পুলওয়ামায় ভারতীয় জওয়ানদের উপর জইশ-ই-মহম্মদের আত্মঘাতী হামলা৷ জঙ্গি হামলায় ৪০ জন ভারতীয় জওয়ান শহীদের আঁচ পড়েছে ২২ গজেও৷ বিশ্বকাপে ভারত-পাক ম্যাচ সংশয়ের মাঝেই ফিরে দেখা লাহোরে শ্রীলঙ্কান টিম বাসের উপর জঙ্গি হামলার ১০ বছর৷

পুলওয়ামা ঘটনার পর কেটে গিয়েছে দু’সপ্তাহ৷ বাতাসের বারুদের গন্ধ ফিঁকে হলেও ভারত-পাক রাজনৈতিক সম্পর্ক এখনও উত্তপ্ত৷ সন্ত্রাসবাদকে প্রশয় দেওয়া দেশের সঙ্গে ক্রিকেটীয় সম্পর্ক ছেদ করার ভারতীয় বোর্ডের দাবি আইসিসি খারিজ করলেও বিশ্বকাপে ক্রিকেটারদের বাড়তি নিরাপত্তার বিষয়টি মেনে নিয়েছে ক্রিকেটবিশ্বের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা৷

এক দশক আগের লাহোরের গদ্দাফি স্টেডিয়ামের ঠিক কাছেই শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটারদের উপর জঙ্গি হামলার ঘটনা অস্বীকার করতে পারে না আইসিসি৷ যে ঘটনার পর থেকে পাকিস্তানের মাটিতে বন্ধ হয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আসর৷ কারণ দশ বছর আগের সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও টাটকা ক্রিকেটবিশ্বের কাছে৷

কাট টু… ৩ মার্চ, ২০০৯৷ পাকিস্তানের লাহোরের হোটেল থেকে গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ম্যাচ খেলতে রওনা দিয়েছিলেন সফরকারী দল শ্রীলঙ্কা৷ গদ্দাফি স্টেডিয়ামের ঢোকার আগেই শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটারদের বাসে হামলা চালায় জঙ্গিরা৷ মুখে কালো কাপড় বেধে সেদিন জয়বর্ধনে, সঙ্গাকারাদের বাসে হামলা চালিয়েছিল জঙ্গিরা। ২০ মিনিট ধরে গুলি চালিয়ে জঙ্গি পালিয়ে গেলেও রক্তাক্ত হয়েছিল বাইশ গজ।

স্টেডিয়ামের বাইরে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ১২ জন জঙ্গি। বাস স্টেডিয়ামের দিকে এগিয়ে আসতেই এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করে জঙ্গিরা৷ জঙ্গিদের গুলিতে আহত হয়েছিলেন সাত জন ক্রিকেটার। এঁদের মধ্যে ছিলেন মাহেলা জয়বর্ধনে, কুমার সঙ্গাকারা, অজন্তা মেন্ডিস, সামারাবিরা, সুরাঙ্গা লাকমল-সহ একাধিক ক্রিকেটার৷ খুব কাছ থেকে মৃত্যকে দেখার ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার কথা পরে শুনিয়েছিলেন জয়বর্ধনে-মেন্ডিসরা৷

সেদিন শ্রীলঙ্কান টিম বাসের চালক মেহের খলিলের উপস্থিত বুদ্ধিই শ্রীলঙ্কান দলকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন৷ বিবিসি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরবর্তী সময়ে শ্রীলঙ্কান বাসের সেই সময়ের চালকের কথায় জানা গিয়েছে, হামলাকারীরা শ্রীলঙ্কান টিম বাসে রকেট-চালিত গ্রেনেড ছুঁড়েছিল। ভাগ্যক্রমে সেটি বাসের গায়ে লাগেনি। ড্রাইভার অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে অবিরাম গুলির মধ্যেই পুরো গতিতে বাস চালিয়েছিলো। হামলাকারীরা বাসের নিচেও গ্রেনেড ছুঁড়েছিল৷ কিন্তু অলৌকিকভাবে সেটা ফাটার আগেই বাসটি তা পেরিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কান টিম বাসটিকে গদ্দাফি স্টেডিয়ামের ভেতরে ঢুকিয়ে ক্রিকেটারদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন বাসচালক খলিল৷ তারপর সোজা মাঠ থেকে হেলিকপ্টারে করে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটারদের দেশে ফেরার বিমানে তুলে দেওয়া হয়েছিল৷

জঙ্গি হামলার ছয় পাক পুলিশ ও দু’জন সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছিল। ক্রিকেটের ইতিহাসে ভয়াবহতম এই হামলা ঘটিয়েছিল পাক মদতপুষ্ট জঙ্গি সংগঠন লস্করই ঝাঙ্গভি।
কোনও সফরকারী দলের টিম বাসে হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে প্রবল সমালোচিত হয়েছিল পাকিস্তান। নিরাপত্তার কারণে গত এক দশকে পাকিস্তানে কোনও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের আয়োজন করেনি আইসিসি। পরিবর্তে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর দুবাইতে অনুষ্ঠিত হত বিভিন্ন ম্যাচ।

এরপর থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে পাকিস্তানের নামের পাশে কালির দাগ পড়ে যায়৷ অবস্থার উন্নতির দাবি করে পিসিবি টেস্ট খেলিয়ে দেশগুলিকে আহ্বান জানালেও অনেক দেশই সেই দাওয়াত প্রত্যাখান করে৷ ২০১৫ সালে জিম্বাবোয়ে এবং ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ পাকিস্তান সফর করলেও ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিয়ে এখনও আইসিসি’র মন জয় করতে পারেনি সন্ত্রাসবাদকে প্রশয় দেওয়া ভারতের এই প্রতিবেশী দেশটি৷ মাঝে ২০১৭ সালে পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে ম্যাচ খেলে আসে শ্রীলঙ্কা৷ ২০০৯এর জঙ্গি হানার ঘটনার আট বছর পর শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট দলের পা পড়েছিল পাকিস্তানের মাটিতে৷