২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বরের মুম্বই হামলা ষষ্ঠ বর্ষ পূর্ণ করল৷ ১৯৯৩ সাল থেকে মুম্বই দফায় দফায় আক্রান্ত হয়েছে৷ কিন্তু ২৬ নভেম্বরের ঘটনা আগের সমস্ত নজির ছাপিয়ে যায়৷ হিংস্র শ্বাপদের মতো একদল জঙ্গি যেভাবে সাগর পেরিয়ে এসে অতর্কিতে অথচ একেবারে নিখুঁত প্ল্যানমাফিক এই আক্রমণ চালিয়েছিল তা সাঙ্ঘাতিক বললেও কম বলা হয়৷ শিকারী নেকড়ের মতো গুঁড়ি মেরে আজমল কাসবের ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাসে ঢোকা এবং ব্যাগ থেকে কালাশনিকভ বের করার সিসিটিভি ফুটেজটির কথা আজও ভোলা যায় না৷ একইসঙ্গে এও ভোলা যায় না যে, এত ভয়ংকর আক্রমণও সেদিন ভারতের আত্মাকে ভূলুণ্ঠিত করতে পারেনি৷ সন্ত্রাসবাদীর গুলি থেকে সন্তান কোলে বোরখা পরিহিতা মাকে বাঁচাতে বুক পেতে দিয়েছিলেন হিন্দু কনস্টেবল৷ নিহত হওয়ার আগে পর্যন্ত তাজ হোটেলে নিজের কর্তব্যপালন করে গিয়েছিলেন পণবন্দি টেলিফোন অপারেটর৷

এইসব নজির থেকে মনে পড়ে যায় আরও এক ঘটনার কথা৷ ২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ভারতের সংসদ আক্রমণ৷ সেদিন সংসদের ভিতরে জনপ্রতিনিধিরা যখন মৃত্যুভয়ে কাঁটা হয়ে প্রহর গণছিলেন, তখন বাইরে বুক চিতিয়ে সন্ত্রাসবাদীদের মোকাবিলা করেছিলেন সংসদ ভবনের সাধারণ প্রহরী থেকে খুরপি হাতে ফুলবাগিচার মালিও৷

এই হচ্ছে ভারতবর্ষ৷ আর এই ভারতবর্ষকে তার দুশমনরা ভয় পায় বলেই সন্ত্রাসবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লেলিয়ে দিয়ে তারা এদেশকে বারংবার রক্তাক্ত করেছে৷ আর সেই কাজ করার জন্যই পাক শাসক জেনারেল জিয়া-উল হকের জমানায় তৈরি করা হয়েছিল ভারতের রক্তমোক্ষণের দীর্ঘস্থায়ী ব্লু-প্রিুন্ট, অপারেশন টোপাজ৷

গোড়ায় এই ব্লু-প্রিন্টে অগ্রাধিকার পেত আজাদ কাশ্মীরি, খলিস্তানপন্থী ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জঙ্গিদের মতো বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি৷ পরে ফোকাসটা কেন্দ্রীভূত হয় কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের সামনে রেখে৷ ১৯৮৯ সালের পর আফগানিস্তানে এই শক্তির প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় তাদের চালান করার সব চাইতে পছন্দসই জায়গাগুলির অন্যতম হয়ে ওঠে ভারতের মাটি৷

অবশ্যই এর পিছনে প্রধানত কাজ করেছে পাকিস্তানের পরাক্রান্ত সামরিক গুপ্তচর বাহিনী ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) মস্তিষ্ক৷ কিন্তু একটা সময় পর্যন্ত তাদের অভিভাবক হিসাবে যাবতীয় ভূমিকা পালন করেছে আমেরিকার সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ)৷ সিআইএ যদি পিছনে না থাকত, তাহলে এক সময় যে বাহিনীর জন্ম হয়েছিল পাক সীমান্তরক্ষীদের স্কাউট হিসাবে, তারা কখনই ক্রমে পাকিস্তানের রাষ্ট্রের ভিতরে রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারত না৷ সিআইএ-র সঙ্গে আইএসআইয়ের খাতিরের একটা বড় প্রমাণ মিলেছিল ২০০১ সালে ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার মাটিতে আত্মঘাতী জোড়া বিমান হামলার পর৷ ওই আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমী দুনিয়ার সহায়তায় নর্দার্ন অ্যালায়েন্স যখন তালিবানি আফগানিস্তানে ঢোকে, তখন সেখানকার কালা-ই-জাঙ্ঘি দুর্গে তালিবানি ও আল-কায়েদা জঙ্গিদের সঙ্গে আটকে পড়েন এক সিআইএ এজেন্ট এবং জনাকয় আইএসআই অফিসার৷ তাদের প্রতি ‘গদ্দারি’ করায় সিআইএ এজেন্টকে জঙ্গিরা হত্যা করে৷ এর পর আটকে-পড়া আইএসআই অফিসারদের বাঁচাতে মাঝপথে যুদ্ধই থামিয়ে দেওয়া হয় এবং হেলিকপ্টার পাঠিয়ে তাঁদের তুলে আনা হয়৷
বলা বাহুল্য, এই দহরম-মহরম একদিনে গড়ে ওঠেনি৷ বহুকাল আগে থেকেই তা তৈরি হয়েছিল এবং ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সাবেক সোভিয়েতের লাল ফৌজ বা রুশ বাহিনী ঢোকার পর সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আরও গাঢ় ও সুমধুরভাবে জমাট বাঁধে৷

১৯৭১ সালের বাংলাদেশ যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে গোহারা হওয়ার কথা পাক সেনাবাহিনী কখনই ভুলতে পারে না৷ কিন্তু সরাসরি ভারতের সঙ্গে এঁটে ওঠা পাকিস্তানের পক্ষে কখনই সম্ভবপর নয়৷ তাই ভারতের বিরুদ্ধে লাগাতার সন্ত্রাস চালানের মাধ্যমে এবং এদেশের নিরীহ মানুষের প্রাণহরণের মধ্য দিয়েই আইএসআই তার শোধ নিতে চেয়েছে৷ ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বরও তার একটি নজির৷ তবে একথাও ভুললে চলবে না, ‘অপারেশন টোপাজে’রও আগে ঠান্ডা যুদ্ধের তুঙ্গাবস্থায় ভারতকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করার জন্য সিআইএ-র গোপন পরিকল্পনা ছিল ‘অপারেশন বলকানাইজেশন’৷ সেক্ষেত্রে বাইরে থেকে ভারতকে রক্তাক্ত করার পাশাপাশি ভারতের অভ্যন্তরেও পঞ্চম বাহিনী খুঁজে বের করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল৷ ভারতকে টার্গেট করে পরবর্তী যাবতীয় সন্ত্রাসবাদী ও নাশকতামূলক কার্যকলাপ তারই চেন রিঅ্যাকশন কি না, তার জবাব কে দেবে?

প্রতিবেদন: নিখিলেশ রায়চৌধুরী