একটা লাল সার্টিনের নাইটি৷ হাতাকাটা৷ বুকের কাছে ক্লিভেজ উঁকি মারার মতো কাটিং৷ হালকা ডিজাইন৷ লম্বায় একবারে পা ঢাকা৷ পাতলা ফিনফিনে৷ একটু হাওয়া গায়ে লাগলেই গায়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকে ৷ এরকম একটা নাইটি মহিলাদের স্বপ্নের পোশাক ৷ আর পুরুষদের কাছে হয়ত স্বপ্নদোষ! না, তার মানে এই নাইটি নাইট ফলসের কারণ নয়, তবে চরিত্র পতনের কারণ হতেই পারে৷ আর সেই পতনকে নিয়েই পরিচালক বিরশা দাশগুপ্ত-র ছবি ‘অভিশপ্ত নাইটি’৷ যার সঙ্গে মিলে মিশে গিয়েছে এক ভালবাসার গল্প৷ দেখতে গেলে ‘অভিশপ্ত নাইটি’ আদ্যপান্ত সেক্স কমেডি ৷ দেখতে গেলে ‘বাঙালি’, ‘বাংলা ছবি’, সর্বপরি ‘বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি’কে নিয়ে ‘খিল্লি’ করার ছবি৷ তবে ‘নাইটি’ ভিতরে রয়েছে ‘হিপোক্রেসি’র মহাকাব্য৷

প্রতিবেদকআকাশ মিশ্র
প্রতিবেদক
আকাশ মিশ্র

হ্যাঁ, বিরশার এই ছবি মহাকাব্য থেকে কিছু কম নয়৷ চিত্রনাট্যের কাঠামো থেকে শুরু করে গল্প বলার আঙ্গিকে ছড়িয়ে, ছিটিয়ে রয়েছে বাঙালির নানা খন্ড কাব্য, নানা পুরনো অভ্যাস৷যা খন্ডের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে ছবিতে৷ আর উঠে এসেছে ‘রোটি কাপড়া থুড়ি নাইটি মকান’-এর এক ফিলোজফি! বিষয়টি নিয়ে একটু খোলসা করার আগে ছবির গল্পটা একটু বলা যাক৷ ‘অভিশপ্ত নাইটি’-র ছবিতে পাওলি দাম পানশালার গায়িকা৷ চরিত্রের নাম মোনিকা ৷ যার শরীরি প্রেমে পড়ে যায় জমিদার বাড়ির ছেলে ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত ওরফে ছবির রাজা ৷ মোনিকার শরীরে ডুব দিতে রাজা সমুদ্রের ধারে ঘুরতে নিয়ে যায় তাঁকে৷ উপহার দেয় লাল সার্টিনের নাইটি৷ বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে সহবাস ৷ তারপর লাভ-সেক্স-ধোঁকা৷ রাজার অন্য মেয়েকে বিয়ে৷ মোনিকার জলে ডুবে আত্মহত্যা৷ পরনে সেই লাল নাইটি৷ আর সেখান থেকে নাইটি গায়ে অভিশপ্ত ট্যাগ৷ সেই নাইটি ঘটনাচক্রে শহর কলকাতায়৷ পাড়ার বৌদির ছাদ থেকে বৌদি, বাড়ির কাজের লোক, শাশুড়ির হাতে হাতে গোটা কলকাতায় নাইটির নাইটওয়াক৷ আর গায়ে উঠলেই ৷ শরীরের ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়ে, সুপ্ত ইচ্ছে, না পাওয়া অনেক কিছু৷ তবে পুরোটাই যৌনতাকে ঘিরে৷ এই নাইটি গিয়ে পৌছায় রবীন্দ্র অনুরাগি গায়িকার কাছে, কখনও হানিমুন কপল, আবার কখনও উঠতি নায়িকার কাছে৷ নাইটি হয়ে যায় স্বপ্ন পূরণের হাতিয়ার ৷ কারোর কাছে যৌনতৃপ্তি, তো কারও মনের মানুষ খুঁজে পাওয়া, আবার কারও কাছে শুধু কেরিয়ারের সাফল্যের সিঁড়িতে ওঠা৷ মোটামুটি এই গল্পকেই একেবারে ডার্ক কমেডির আঙ্গিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন ছবির পরিচালক বিরশা দাশগুপ্ত ও চিত্রনাট্যকর দেবালয় ভট্টাচার্য ৷ তবে গল্পের রসদে হাসিঠাট্টা ভরলেও খোঁচা মেরেছেন হিপোক্রেসিকে৷ বলা ভাল বাঙালির ‘হিপোক্রেসি’কে৷ খোঁচা মেরেছেন বাঙালির নাটুকে রাবিন্দ্রিক প্রেমকে ৷ খোঁচা মেরেছেন মন্দ কাজে হাতে নাতে ধরা পরে ‘অজুহাত’ দেওয়ার পুরনো অভ্যাসকে৷

বিরশার ‘অভিশপ্ত নাইটি’-র ভিতর রয়েছে অনেক কিছু যা সত্যিই হাসতে হাসতে ভাবাতে বাধ্য৷ রয়েছে মহাভারতের পাশা খেলা ও দুর্যধনের কাছে দ্রৌপদিকে জুয়ার অমানত কাব্য৷ রয়েছে রাজা দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার প্রতিশ্রুতি ও সহবাস৷ রয়েছে কাস্টিং কাউচকে উসকে দিয়ে এক উঠতি নায়িকার শরীরের ব্যবহার৷ রয়েছে নিস্বার্থ এক ভালবাসার গল্প৷

‘অভিশপ্ত নাইটি’ এই বাইরেও টলিউড ইন্ডাস্ট্রিকে খিল্লি করার ছবি৷ বাদ পড়েনি সেন্সর বোর্ডের মেম্বার থেকে শুরু করে চিট ফান্ডের মালিক, দমকল মন্ত্রী, প্রবীন নাট্যঅভিনেতা, নারীবাদী সমাজসেবিকা৷ তীর্যকভাবে ছবিতে টেনে আনা হয়েছে পরিচালক হরনাথ চত্রবর্তী থেকে শুরু করে সৃজিত, অনীক দত্তকে৷ সমকামী ফিল্ম ম্যাগাজিনের সম্পাদক সেজে ছবিতে এসেছেন প্রয়াত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষও৷ এমনকি টলিউডের হার্টথ্রব বলে চর্চিত দেবের ক্যারিশমাও রয়েছে ছবিতে৷

‘অভিশপ্ত নাইটি’ ছবির আসল শক্ত খুঁটি-ই হল ছবির চিত্রনাট্য ও অসাধারণ স্ক্রিন প্লে৷ বলা ভাল ছবির উন্নত, স্মার্ট, ঝকঝকে গল্প বলার আঙ্গিক-ই আকর্ষণীয় করে তুলেছে ছবিকে৷ গ্রাফিক্স কমিকসের ব্যবহার ছবিকে পারফেক্ট ডার্ক কমেডি করে তুলতে সাহায্য করেছে৷ অভিনয়ে পরমব্রত, পাওলির নাম সবার আগে৷ কমেডির ছন্দে লকেট চট্টোপাধ্যায় তনিমা সেন অসাধারণ৷ তনুশ্রী ও জোজো বেশ নজর কাড়ে৷ শেষমেশ বলতে হয় ‘অভিশপ্ত নাইটি’ ছবিতে নাইটি একটা রূপক বা আর্কিটাইপ৷ আসলে নাইটির ভিতরে শরীর নয়, মনে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছে, হিপোক্রেসিকে ‘অভিশপ্ত’ ট্যাগ দিয়ে সামনে নিয়ে আসা৷ আর অবশ্যই নাইটির আড়ালে এক সত্য ভালবাসা খোঁজার গল্প৷ যা শেষমেশ আটকে যায় অভিশপ্ত পাজামাতে৷ ‘অভিশপ্ত পাজামা’? উত্তর পেতে হলে ‘নাইটি’ দেখুন৷ যা হাসাবে নয়, ভাবাবেও৷